
টরন্টো, কানাডার সবচেয়ে বড় নগরী, একসময় স্বপ্নপূরণের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু দিন দিন সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেড়ে গেছে যে, এখন অনেকের জন্য স্বপ্ন নয়, বরং দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে এই শহরে টিকে থাকা। ভাড়া, বাড়ির দাম, খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ – সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মাসিক আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে কেবল অপরিহার্য চাহিদা মেটাতে। ফলে টরন্টোর বহনক্ষমতা বা এ্যাফোর্ডেবিলিটি সংকট দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, টরন্টোতে এক শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের গড় ভাড়া মাসে প্রায় ২,০৩০ ডলার এবং দুই শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া প্রায় ২,৫০৬ ডলার। এই ভাড়া পরিশোধ করতে হলে একজন ভাড়াটিয়ার বার্ষিক আয় হতে হবে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ হাজার ডলার। অথচ শহরের গড় আয় অনেক নিচে থাকায় অধিকাংশ মানুষকে প্রতি মাসেই ভাড়ার বোঝা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আবাসন খাতে সাশ্রয়ী বাড়ির সরবরাহ কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। নতুন প্রকল্পে অধিকাংশই বিলাসবহুল কন্ডো বা উচ্চ আয়ের মানুষকে কেন্দ্র করে নির্মিত হচ্ছে। ফলে তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী এবং নতুন অভিবাসীদের জন্য বাসস্থান খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে।
শুধু আবাসন নয়, গত এক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। দুধ, ডিম, রুটি, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ পরিবারগুলোকে মাসের শেষে সংসার চালাতে কষ্ট করতে হচ্ছে। গড়ে একটি পরিবারকে আগের তুলনায় খাদ্য ব্যয়ে শত শত ডলার বেশি খরচ করতে হচ্ছে, যা সরাসরি মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয় ও জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলছে।
এদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের পাশাপাশি পরিবহন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। শহরের ভেতরে চলাচল করা যেমন ব্যয়বহুল হচ্ছে, তেমনি যারা সাশ্রয়ী বাসস্থানের খোঁজে শহরের বাইরে চলে যাচ্ছেন, তাদের জন্য দীর্ঘ যাতায়াত এবং বাড়তি খরচ এক নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হচ্ছে না, বরং খরচের ধরণ বদলাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে টরন্টোতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। তারা বলছেন, শহরের সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে। অন্যথায় আগামী কয়েক বছরে টরন্টো শুধু ধনীদের শহরে পরিণত হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ আর টিকে থাকতে পারবে না।
একজন শহরবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখন মাসের শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করার কথা ভাবাই যায় না। সব আয় ভাড়া আর বাজার খরচেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।” তার মতো অসংখ্য পরিবার প্রতিদিনের বাস্তবতায় সংগ্রাম করছে, যেখান থেকে বের হওয়ার সহজ কোনো পথ তারা খুঁজে পাচ্ছে না।
টরন্টোর বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্যই নয়, বরং পুরো শহরের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি এখনই কার্যকর সমাধান না আসে, তবে আগামী দিনে টরন্টোতে বসবাস করা কেবল উচ্চ আয়ের মানুষের জন্যই সম্ভব হবে, যা শহরের বহুমুখী সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
