
কানাডার সবচেয়ে বড় শহর টরন্টোতে সম্প্রতি এক অস্বাভাবিক অপরাধপ্রবণতা শহরবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবীণ ও একা চলাচলকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ চুরির ঘটনা বেড়ে চলেছে আর এই চুরির পেছনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর সক্রিয় ভূমিকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ছয় মাসে অন্তত ২০টিরও বেশি অভিযোগ এসেছে, যেখানে এক বিশেষ কৌশল স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে। এই কৌশলকে বলা হচ্ছে ‘ডিসট্র্যাকশন থেফট’ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চুরি। সাধারণত দুই বা তিনজন মিলে দল বেঁধে এই চুরি সংঘটিত হয়। এক ব্যক্তি ভুক্তভোগীর মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দেয়, আর অন্যরা দ্রুত গহনা, ঘড়ি, পার্স, মোবাইল বা নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়।
ঘটনাগুলো ঘটছে মূলত রাস্তার ধারে, শপিং সেন্টারের পার্কিং লট কিংবা আবাসিক এলাকার গলিতে। অপরাধীরা হঠাৎ করে বন্ধুভাবাপন্ন আচরণ করে কাছে আসে কখনো দিকনির্দেশনা চেয়ে, কখনো হাতে থাকা আংটি বা চেইন বদলানোর প্রস্তাব দিয়ে, আবার কখনো সহানুভূতির গল্প শুনিয়ে দয়া প্রার্থনা করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা গহনা বা ব্যাগ খুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই অপরাধ শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং শহরের প্রবীণদের মনে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলছে। অনেক প্রবীণ জানিয়েছেন, তারা এখন আর একা বাইরে বের হতে চান না এবং গহনা পরতেও ভীত বোধ করেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক চাপ এবং মাদকের আসক্তি বিশেষ করে মহামারীর পর বেকারত্বের বৃদ্ধি কিছু মানুষকে দ্রুত অর্থ পাওয়ার সহজ উপায় হিসেবে এই ধরনের অপরাধে ঠেলে দিচ্ছে। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাই বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টরন্টো পুলিশ ইতোমধ্যে একাধিক অভিযানে কয়েকজন সন্দেহভাজন নারীকে আটক করেছে এবং আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এটি কোনো এলোমেলো অপরাধ নয়; বরং একটি ছোট নেটওয়ার্ক শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে টার্গেট বেছে নিচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার পর তারা দ্রুত এলাকা পরিবর্তন করে যাতে সহজে শনাক্ত না হয়।
পুলিশ শহরবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কেউ যদি অচেনা ব্যক্তি হঠাৎ অতিরিক্ত বন্ধুসুলভ আচরণ করে বা শারীরিকভাবে কাছে এসে কিছু দেখাতে চায়, তাহলে সতর্ক হতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণদের ৯১১ নম্বরে দ্রুত কল করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শপিং সেন্টার মালিকদের নজরদারি ক্যামেরা সচল রাখা ও ফুটেজ সংরক্ষণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
টরন্টো সিটি কাউন্সিলে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে শহরজুড়ে ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তাব উঠেছে, যাতে মানুষ শেখে কীভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করে চুরির কৌশল থেকে বাঁচা যায়। কিছু কাউন্সিলর পার্কিং লটে বাড়তি আলো এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন।
সমাজবিশ্লেষকরা বলছেন, নারীরা সাধারণত এ ধরনের অপরাধে কম জড়িত থাকেন। তাই এই প্রবণতা নতুন এক সামাজিক সংকেত। তাদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলা না করা গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
শহরের সাধারণ মানুষ এখন পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে। গ্রেফতার হওয়া সন্দেহভাজনদের বিচার প্রক্রিয়া এগোলে আদালতের রায় ভবিষ্যতে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। টরন্টোবাসীর আশা, দ্রুত এই অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে এবং শহর আবার সেই আগের নিরাপত্তা ফিরে পাবে যেখানে যে কেউ নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারে, কেনাকাটা করতে পারে এবং গহনা পরে বের হতে পারে কোনো ভয় ছাড়াই।
