অন্টারিও বনাম টরন্টোতে নীতিগত দ্বন্দ্ব বাড়ছে

অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার ও টরন্টো সিটি প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান নীতিগত মতপার্থক্য সম্প্রতি এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে

অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার ও টরন্টো সিটি প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান নীতিগত মতপার্থক্য সম্প্রতি এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অবকাঠামো, পরিবহন, গৃহায়ণ, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় করনীতি ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ এখন আর পর্দার আড়ালে নেই বরং তা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রাদেশিক ও নগর প্রশাসনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখছে।

২০২৪ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, টরন্টোর মোট বাজেট ছিল প্রায় ১৮.৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যয় হয়েছে ৪.৭ বিলিয়ন, পুলিশ ও নিরাপত্তায় ১.২ বিলিয়ন, আবাসন ও আশ্রয়কেন্দ্রে ২.১ বিলিয়ন এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবায় প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার।

- Advertisement -

কিন্তু সীমিত রাজস্ব আয়ের কারণে বাজেটে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলারে। মেয়র ও সিটি কাউন্সিল বারবার জানিয়েছেন, এই ঘাটতি পূরণের জন্য প্রাদেশিক সরকারের বাড়তি আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য।

টরন্টোর সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা এখন সাশ্রয়ী আবাসন সংকট। বর্তমানে প্রায় ১,১৫,০০০ পরিবার সাশ্রয়ী আবাসনের অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে। অথচ প্রাদেশিক সরকার গত তিন বছরে মাত্র ৮,০০০ নতুন ইউনিটের অনুমোদন দিয়েছে।

শহর প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর কমপক্ষে ১৫,০০০ নতুন ইউনিট তৈরি না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অপেক্ষমাণ তালিকার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে বাড়িভাড়া বছরে গড়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রাদেশিক গড় বৃদ্ধির হার (প্রায় ৭%)–এর দ্বিগুণেরও বেশি। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ।

টরন্টো ট্রানজিট কমিশন (টিটিসি) প্রতিদিন প্রায় ২.১ মিলিয়ন যাত্রী বহন করে, যা দেশের অন্যতম ব্যস্ত গণপরিবহন নেটওয়ার্ক। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবার মান বজায় রাখতে সংস্থাটির বছরে অতিরিক্ত ১.২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

প্রাদেশিক সরকার থেকে বরাদ্দ আসছে মাত্র ১.১ বিলিয়ন ডলার, ফলে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে শহরকে কর ও ভাড়া বৃদ্ধির পথে হাঁটতে হচ্ছে। গত দুই বছরে যাত্রী ভাড়া তিনবার বেড়েছে, এবং আগামী বছর আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা জনঅসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে পরিস্থিতিও একই রকম। টরন্টোর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে রোগীর চাপ প্রাদেশিক গড়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি হলেও, অন্টারিও সরকারের বাজেটে এই অতিরিক্ত চাহিদা প্রতিফলিত হয়নি। ফলে চিকিৎসা সেবায় দীর্ঘ অপেক্ষা ও অব্যবস্থাপনা বেড়েছে।

শিক্ষা খাতেও চিত্র উদ্বেগজনক। গত পাঁচ বছরে টরন্টো স্কুল বোর্ডে ছাত্রসংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ, কিন্তু শিক্ষক সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ এবং নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরি হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ হারে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষের গড় আকার ৩২ জন থেকে বেড়ে ৩৯ জনে পৌঁছেছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

টরন্টোর করনীতিও এখন রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে শহরের গড় আবাসিক সম্পত্তি কর প্রাদেশিক গড়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রাদেশিক সরকার সরাসরি বলেছে, শহরকে আরও কর বাড়াতে হবে।

কিন্তু শহর প্রশাসনের দাবি, ইতিমধ্যেই নাগরিকদের ওপর করের বোঝা বেড়ে গেছে; নতুন করে কর বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ টরন্টোবাসী মনে করেন প্রাদেশিক সরকার তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। অন্যদিকে শহরতলির ৪৮ শতাংশ বাসিন্দা মনে করেন, টরন্টো নিজেদের অদক্ষ ব্যবস্থাপনার দায় প্রদেশের ওপর চাপাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দ্বন্দ্বের শিকড় গভীরে। অন্টারিওর কনজারভেটিভ নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার এবং ঐতিহ্যগতভাবে লিবারেলমুখী টরন্টো সিটি প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘদিনের নীতিগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।

টরন্টো কানাডার সবচেয়ে বড় নগরী এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় এর নীতি ও উন্নয়ন প্রাদেশিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে প্রাদেশিক সরকার শহরের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে শহর প্রশাসন চাইছে আর্থিক ও নীতিগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে।

বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ প্রক্রিয়া কার্যত অচল। আর্থিক সংকট ও নীতিগত দ্বন্দ্ব যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে টরন্টোর আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই টানাপোড়েন নিরসনের জন্য প্রাদেশিক ও নগর প্রশাসনের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলাই একমাত্র সমাধান। না হলে শহরের বাসিন্দাদেরই এই রাজনৈতিক সংঘাতের খেসারত দিতে হবে।

টরন্টো-অন্টারিও বিরোধ এখন শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিফলন। গৃহায়ণ সংকট, পরিবহন অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ঘাটতি এবং করনীতি নিয়ে মতপার্থক্য সবকিছু মিলিয়ে এই দ্বন্দ্ব যদি এখনই না থামে, তাহলে কানাডার বৃহত্তম শহরটি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে।

- Advertisement -

Read More

Recent