উত্তর অন্টারিওতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণ প্রকল্পে জনরোষ: পরিবেশঝুঁকি ও পরামর্শহীনতার অভিযোগ

উত্তর অন্টারিওর শান্ত গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে প্রাদেশিক সরকারের তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণ পরিকল্পনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে

উত্তর অন্টারিওর শান্ত গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে প্রাদেশিক সরকারের তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণ পরিকল্পনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নাইরন এবং হাইমান টাউনশিপসহ আশপাশের কয়েকটি কমিউনিটি সোমবার একত্রিত হয়ে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকরা অভিযোগ করেছেন যে, প্রকল্পটি নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ নেওয়া হয়নি, যা অঞ্চলটির পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

বিরোধের সূত্রপাত ঘটে গত গ্রীষ্মে, যখন নাইরন ও হাইমানের একজন মিউনিসিপাল কাউন্সিলর ব্যাক রোড পরিদর্শনকালে জানতে পারেন যে প্রাদেশিক পরিবহন ও খনি মন্ত্রণালয় নিপিসিং ফার্স্ট নেশন থেকে প্রায় ১৮,০০০ ঘনমিটার তেজস্ক্রিয় নিওবিয়াম পদার্থ অ্যাগনিউ লেক অঞ্চলে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে। অ্যাগনিউ লেক শহরের প্রধান পানির উৎস থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

- Advertisement -

নাইরন-হাইমান টাউনশিপের মেয়র অ্যামি মেজি সভায় উপস্থিত নাগরিকদের বলেন, “এই পুরো পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের সঙ্গে একবারও পরামর্শ করা হয়নি। আমাদের কেবল বলা হয়েছে এটি ‘প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ’, যেন এটি সাধারণ পাথরের মতো নিরাপদ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই পদার্থে রয়েছে ইউরেনিয়াম, রেডিয়াম-২২৬, নিওবিয়াম, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সেলেনিয়াম, সিলভার ও ম্যাঙ্গানিজ যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।”

প্রাদেশিক দুইটি মন্ত্রণালয় গত এপ্রিল মাসে টাউনশিপকে একটি বিশদ কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। যদিও প্রতিবেদনে পরিবহন, সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা পদ্ধতি উল্লেখ ছিল, তবে ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক অনুপস্থিত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। টাউনশিপ স্থানীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সংস্থা হাচিসন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স লিমিটেডকে এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণের জন্য নিযুক্ত করে। সংস্থার বিশ্লেষণে উঠে আসে, প্রতিবেদনে অন্তত আটটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা অনুপস্থিত, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো “সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়ন”। এই মূল্যায়ন ছাড়া প্রকল্পের নিরাপত্তা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, অ্যাগনিউ লেক ইতিমধ্যেই পরিবেশগত সংকটে রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ জমা হলে লেকের জৈবপ্রবাহ, পানির মান এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বিপর্যস্ত হতে পারে। নাইরন-হাইমান টাউনশিপের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা বেলিন্দা কেচাবো বলেন, “প্রদেশ এমন একটি লেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে, যা ইতিমধ্যেই বিপদের মুখে। এটি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে।”

বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে কোনো গণশুনানি হয়নি এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। সভায় উপস্থিত বহু নাগরিক দাবি করেছেন যে প্রকল্পটি শুরু হওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং গণপরামর্শ সম্পূর্ণভাবে বাধ্যতামূলক করা হোক।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম ও নিওবিয়ামের মতো পদার্থ একবার মাটিতে বা পানিতে প্রবেশ করলে তা দশকের পর দশক ধরে সক্রিয় থাকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে স্থানীয় খাদ্য চেইন, পানির মান ও জীববৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখোমুখি হয়।

টাউনশিপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা প্রাদেশিক সরকারের কাছে প্রকল্প স্থগিতের দাবি জানাবে এবং বিকল্প সমাধান নিয়ে আলোচনা করার জন্য জরুরি বৈঠকের আহ্বান করবে। মেয়র মেজি বলেন, “আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই, কিন্তু উন্নয়ন হতে হবে নিরাপত্তা ও বিজ্ঞানের আলোকে। স্থানীয় মানুষদের জীবন ও পরিবেশের মূল্য দিয়ে কোনো প্রকল্প চালানো যাবে না।”

এখন দেখার বিষয়, প্রাদেশিক সরকার কি স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের এই তীব্র প্রতিবাদের পর তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করবে কিনা। তবে একটি বার্তা স্পষ্ট: উত্তর অন্টারিওর জনগণ তাদের মাটি, পানি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করতে রাজি নয়।

This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI

- Advertisement -

Read More

Recent