
কানাডার প্রদেশ কুইবেক এক গভীর জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রদেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার কমে যাবে। কুইবেক ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিকসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, জন্মহার হ্রাস, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং অস্থায়ী শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি কারণ মিলেই প্রদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রাকৃতিক গতি ভেঙে দিচ্ছে।
২০২৪ সালের হিসাবে কুইবেকের জনসংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ। ২০৩০ সালের মধ্যে তা কিছুটা বেড়ে ৯২ লাখে স্থিতিশীল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, এরপর ধীরে ধীরে শুরু হবে পতন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০৫০ সালের দিকে গিয়ে প্রদেশটির জনসংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত বা সামান্য হ্রাসপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকবে, যখন কানাডার অন্য প্রদেশগুলো যেমন অন্টারিও ও আলবার্টায় অভিবাসন ও জন্মহার বৃদ্ধির কারণে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী, কুইবেকের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল শক্তি এতদিন ছিল আন্তর্জাতিক অভিবাসন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাদেশিক সরকার ফরাসি ভাষা রক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় জোরদার করার লক্ষ্যে অভিবাসন কোটা সীমিত করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী শ্রমিক ও নতুন স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা দ্রুত কমে এসেছে।
সংস্থার প্রধান বিশ্লেষক ক্লদ লেমিউ জানান, জন্মহার হ্রাস ও অভিবাসন প্রবাহ কমে যাওয়ায় কুইবেকের জনসংখ্যা সঙ্কুচিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রদেশটির গড় বয়স ৪৩ বছর, যা কানাডার মধ্যে অন্যতম উচ্চ। তরুণ জনগোষ্ঠীর পরিমাণ দ্রুত কমে আসায় আগামী দুই দশকে শ্রমবাজারে বড় সংকট দেখা দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
অঞ্চলভেদেও এই পরিবর্তন সমান নয়। কুইবেক সিটি অঞ্চল ২০২১ থেকে ২০৫১ সালের মধ্যে প্রায় ২১ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু মন্ট্রিয়ল বিপরীত চিত্র দেখাবে। গবেষণা অনুযায়ী, মন্ট্রিয়ল একই সময়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ হারাবে।
মন্ট্রিয়লের জনসংখ্যা হ্রাসের কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করছেন ক্রমবর্ধমান আবাসন ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং তরুণদের পরিবার গঠনের অনীহা। একই সঙ্গে ভাষা ও সাংস্কৃতিক নীতি কঠোর হওয়ায় অনেক বিদেশি অভিবাসী প্রদেশ ছেড়ে অন্টারিও, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বা আলবার্টার দিকে চলে যাচ্ছেন।
জনসংখ্যা বিশ্লেষক মিশেল দার্ভো বলেন, কুইবেক একসময় কানাডার সাংস্কৃতিক হৃদয় ছিল, কিন্তু এখন প্রাদেশিক নীতিমালার কারণে বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার জন্য কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলস্বরূপ মন্ট্রিয়ল জনবসতি হারাচ্ছে, আর রাজধানী অঞ্চল তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রজনন হারও ঐতিহাসিকভাবে নেমে গেছে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে একজন নারীর গড় সন্তান সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ৬, বর্তমানে তা ১ দশমিক ৩-এ এসে ঠেকেছে—যা কানাডার অন্যতম সর্বনিম্ন হার। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, শিশু যত্নের সীমিত সুযোগ, এবং কাজ-পরিবারের ভারসাম্য রক্ষার জটিলতা তরুণ দম্পতিদের সন্তান ধারণে নিরুৎসাহিত করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর অভাব, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, এবং স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠবে। সরকারকে প্রজনন উৎসাহ, পারিবারিক প্রণোদনা ও অভিবাসন সহজীকরণের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে কুইবেক সরকার বলছে, তাদের নীতির লক্ষ্য দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং “মানসম্পন্ন অভিবাসন।” সরকারের এক মুখপাত্রের ভাষায়, ফরাসি ভাষায় দক্ষ এবং সমাজে দ্রুত একীভূত হতে সক্ষম অভিবাসীদেরই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
সমালোচকেরা মনে করেন, এই নীতি প্রদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। তাদের মতে, কুইবেক যদি দ্রুত অভিবাসন বৃদ্ধি ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা না নেয়, তবে আগামী দুই দশকে প্রদেশটি এক গভীর জনসংখ্যাগত সংকটে পড়বে—যেখানে সংস্কৃতি টিকে থাকবে, কিন্তু মানুষ কমে যাবে।
অর্থাৎ, কানাডার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রদেশ কুইবেক এখন এক নীরব পরিবর্তনের পথে—যেখানে ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্য অটুট থাকলেও জনসংখ্যার ঘড়ি ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।
