
অন্টারিওর ইয়র্ক অঞ্চলের এক অভিজ্ঞ নারী প্যারামেডিককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার দায়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে মত প্রকাশের জেরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ছয় বছর আগে ইউনিয়ন নেতৃত্ব থেকে সরে গিয়ে আবারও সক্রিয় কর্মজীবনে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ক্যাথেরিন গ্রেজজ্যাক নামের এই প্যারামেডিক। তিনি জানান, জুলাইয়ের শেষে মাঠে ফিরে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগেই, গত ২০ জুন, তাকে আকস্মিকভাবে বরখাস্তের নোটিশ পাঠানো হয়।
গ্রেজজ্যাক বলেন, “আমি গাজা ও অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক হামলা, বোমা বর্ষণ এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও শিশুদের হত্যার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলাম। আমি মনে করেছিলাম, মানবতার পক্ষে কথা বলা একজন স্বাস্থ্যকর্মীর নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সেটিই এখন আমার পেশাগত জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ইয়র্ক রিজিয়নাল মিউনিসিপালিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন কর্মীর “উদ্বেগজনক মন্তব্য” পাওয়া যায় এবং তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত শেষে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় ওই কর্মীর আচরণ নীতিমালা ভঙ্গ করেছে, ফলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে কর্তৃপক্ষ ওই পোস্টের বিষয়বস্তু বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
ক্যাথেরিন গ্রেজজ্যাক দীর্ঘদিন ধরে কানাডিয়ান ইউনিয়ন অব পাবলিক এমপ্লয়িজ (সিইউপিই) অন্টারিওর নির্বাহী বোর্ডের সদস্য ছিলেন। ইউনিয়ন থেকে পদত্যাগের পর তিনি আবারও মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে আগ্রহী হন। তিনি বলেন, “আমি প্যারামেডিক হিসেবে আমার পেশাকে ভালোবাসি, কারণ এটি শুধু একটি চাকরি নয়, এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এখন আমি এমন এক বাস্তবতার মুখে, যেখানে মানবিকতা ও মত প্রকাশের অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গণহত্যার বিরোধিতা করা জননিরাপত্তার কোনো হুমকি নয়। বরং একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে মানুষের জীবনের মূল্য সম্পর্কে কথা বলা আমার পেশাগত দায়বদ্ধতার অংশ। আমি বিশ্বাস করি, আমার চাকরি পুনর্বহাল করা হবে এবং আমি আবারও ইয়র্ক রিজিয়নের জনগণের সেবা করতে পারব।”
অন্যদিকে, শ্রম অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে। তাদের মতে, একজন সরকারি সেবাকর্মীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মন্তব্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে না। এ ধরনের পদক্ষেপ কর্মক্ষেত্রে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।
অন্টারিওর মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে কোনো মতামত প্রকাশের জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া হলে তা স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রেজজ্যাকের আইনজীবীরা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করছেন বলে জানা গেছে।
প্রদেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে যাতে কর্মীরা নৈতিক বা মানবিক ইস্যুতে মত প্রকাশ করলে তা চাকরির ঝুঁকিতে না ফেলে।
ঘটনাটি বর্তমানে কানাডার শ্রমনীতি, কর্মস্থলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশাগত নৈতিকতা ও মানবতার প্রশ্নে কারও কণ্ঠরোধ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
অর্থাৎ, অন্টারিওর এই বরখাস্তের ঘটনা কেবল একজন কর্মীর ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং সমগ্র কানাডায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে চিন্তার দরজা খুলে দিয়েছে যেখানে মানবতার পক্ষে কথা বলাও আজ চাকরি হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
