
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও তার স্ত্রী ব্রিজিত মাখোঁ যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের সামনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করতে যাচ্ছেন উদ্দেশ্য একটাই, প্রমাণ করা যে ব্রিজিত মাখোঁ একজন নারী।
এই উদ্যোগ আসে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দক্ষিণপন্থী ভাষ্যকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনফ্লুয়েন্সার ক্যান্ডেস ওয়েন্স দাবি করেন ব্রিজিত আসলে জন্মগতভাবে পুরুষ ছিলেন। এই মন্তব্যের পর ফ্রান্সসহ বিশ্বজুড়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়, যা এখন আন্তর্জাতিক মানহানির মামলায় রূপ নিয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট দম্পতির আইনজীবী টম ক্লেয়ার জানিয়েছেন, ওয়েন্সের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই আদালতে ব্রিজিতের বায়োলজিক্যাল লিঙ্গ পরিচয় সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, “ব্রিজিত মাখোঁর জন্য এই অভিযোগ অবিশ্বাস্যরকম হতাশাজনক। এটি কেবল ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত একটি ষড়যন্ত্র, যা প্রেসিডেন্ট মাখোঁর মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা।”
টম ক্লেয়ার আরও জানান, ব্রিজিত ও ইমানুয়েল মাখোঁ দুজনেই এই আক্রমণকে ব্যক্তিগত জীবনে এক গভীর আঘাত হিসেবে দেখছেন।
“কেউ যদি তার কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য আনতে চেষ্টা করেন এবং তখন এমন আক্রমণের শিকার হন, তা নিঃসন্দেহে কষ্টদায়ক। প্রেসিডেন্ট মাখোঁও এর ব্যতিক্রম নন।”
যদিও আইনজীবী প্রমাণের নির্দিষ্ট ধরন বা বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেননি, তিনি স্পষ্ট করে বলেন যা উপস্থাপন করা হবে, তা হবে কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণযোগ্য তথ্য। তার ভাষায়, “আমরা আদালতে এমন প্রমাণ উপস্থাপন করব যা অস্বীকার করার সুযোগ থাকবে না। ওয়েন্সের অভিযোগ যে মিথ্যা, তা প্রমাণের জন্য আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়েন্সের আইনজীবীরা ইতোমধ্যে মামলাটি বাতিলের আবেদন করেছেন। তবে মাখোঁ দম্পতির পক্ষ থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ক্যান্ডেস ওয়েন্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশাল প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ৬২ লাখেরও বেশি। তিনি একাধিকবার পোস্ট করে দাবি করেছেন যে, “ব্রিজিত মাখোঁ আসলে একজন পুরুষ”। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তিনি এক্স (পূর্বের টুইটার)-এ লেখেন “ব্রিজিত মাখোঁ একজন পুরুষ এই দাবির স্বপক্ষে আমি আমার সমগ্র পেশাগত যশ বাজি ধরতে পারি।”
ওয়েন্সের এই মন্তব্য ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত ইউরোপীয় দক্ষিণপন্থী মহলে এই দাবি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
ফ্রান্সে বিষয়টি নিয়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকেই একে নারীদের বিরুদ্ধে অপমানজনক প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, “এটি শুধু ব্রিজিত মাখোঁর মানহানিই নয়, বরং ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় মর্যাদারও অবমাননা।”
ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ইমানুয়েল মাখোঁ এর আগেও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুজব ও আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু এবার বিষয়টি আরও সংবেদনশীল কারণ এতে তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও পরিচয়ের প্রশ্ন জড়িত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে “ডিজিটাল চরিত্রহনন” বা character assassination through misinformation–এর এক নতুন নজির। সামাজিক মাধ্যমে ভিত্তিহীন গুজব, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও লিঙ্গবিদ্বেষী প্রচারণা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আইনজীবীরা বলছেন, যদি আদালতে ব্রিজিত মাখোঁর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গৃহীত হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে ডিজিটাল মানহানি ও অনলাইন লিঙ্গ-অপবাদ সংক্রান্ত মামলাগুলোর জন্য এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিজিত মাখোঁর প্রতি ক্যান্ডেস ওয়েন্সের অভিযোগ হয়তো এক মুহূর্তের সামাজিক মাধ্যম পোস্ট হিসেবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এখন তা আন্তর্জাতিক আদালতের বিচার্য বিষয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট দম্পতি যে আইনি পথে হেঁটেছেন, তা শুধু ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষার জন্য নয় বরং বিশ্বজুড়ে নারীসম্মান ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যও এক প্রতীকী পদক্ষেপ হতে পারে।
