
দীর্ঘ প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও নির্বাচন বাতিলের জটিলতার মধ্যে অবশেষে কানাডার ফেডারেল আদালত বৃহস্পতিবার এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, মন্ট্রিয়ল অঞ্চলের কানেসাতাকে (Kanesatake) মোহাক কমিউনিটির বিদায়ী পাঁচজন চিফ এখন থেকে একটি তত্ত্বাবধায়ক কাউন্সিল (Caretaker Council) গঠন করতে পারবেন, যা সীমিত পরিসরে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জরুরি সেবা পরিচালনা করবে।
এই রায়টি এসেছে হঠাৎ করে বাতিল হওয়া নির্বাচনের প্রায় দুই মাস পর, যখন গোটা কমিউনিটি কার্যত প্রশাসনবিহীন অবস্থায় পড়েছিল। আদালতের মতে, এমন এক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক শূন্যতা কমিউনিটির জন্য “অপূরণীয় ক্ষতির” ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
ফেডারেল আদালত তাদের রুলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে – বিদায়ী পাঁচজন চিফ একটি অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক কাউন্সিল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের এখতিয়ার থাকবে কেবলমাত্র কমিউনিটির সদস্যদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা পর্যন্ত সীমিত। এই কাউন্সিলের কাজ হবে কমিউনিটিতে সৃষ্টি হওয়া প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ করা।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থা চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং একটি “সংক্রমণকালীন” (transitional) পদক্ষেপ, যতদিন না নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হয় এবং নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
কানেসাতাকে মোহাক কমিউনিটির নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য গত ২ আগস্ট ভোটগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। নির্বাচন কমিশন এবং কমিউনিটির অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধের জেরে এই সিদ্ধান্ত আসে।
নির্বাচন বাতিল হওয়ার পর থেকে বিদায়ী চিফরা কার্যত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। এমনকি তারা কাউন্সিলের অফিসিয়াল ইমেইল অ্যাকাউন্টেও প্রবেশাধিকার হারান, যা প্রশাসনিক স্থবিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
কানেসাতাকে বর্তমানে গভীরভাবে বিভক্ত একটি কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে। সাবেক গ্র্যান্ড চিফসহ কমিউনিটির কিছু প্রভাবশালী সদস্য বিদায়ী পাঁচজন চিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তারা “ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা” করছেন এবং নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথে বাধা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, বিদায়ী চিফদের দাবি তারা কেবলমাত্র কমিউনিটির স্বার্থেই আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন, যাতে মৌলিক সেবাগুলো যেমন স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা বন্ধ না হয়ে যায়।
আদালত জানিয়েছে, নির্বাচনের বৈধতা ও ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়া নিয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানি ২০২৬ সালের আগে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ, আগামী অন্তত এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কমিউনিটি এই অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপরই নির্ভরশীল থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় সাময়িকভাবে প্রশাসনিক স্থিতি ফিরিয়ে আনলেও রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করতে পারে। কারণ, একপক্ষ মনে করছে এটি চিফদের ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ দিচ্ছে, অন্যপক্ষ একে কমিউনিটির প্রয়োজনীয় স্থিতি রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
এই রায় কানাডার আদিবাসী প্রশাসনের মধ্যে একটি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফেডারেল আদালত একদিকে যেমন প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের পথ দেখিয়েছে, তেমনি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সরাসরি কোনো অবস্থান নেয়নি যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য দরজা খোলা রেখেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কানেসাতাকে মোহাক কমিউনিটির এই সংকট আদিবাসী স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং কমিউনিটি প্রশাসনের আইনি কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
আদালতের নির্দেশে কানেসাতাকে কমিউনিটির জরুরি সেবা আপাতত সচল রাখা গেলেও, স্থায়ী সমাধান এখনও অনেক দূরের পথ। আগামী মাসগুলোতে এই তত্ত্বাবধায়ক কাউন্সিল কীভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং কমিউনিটির ভেতরকার বিভাজন কতটা নিরসন হয় তাই এখন সবার নজরে।
