
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আপিল আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আরোপিত শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া আগের এক রুলিং বহাল রেখেছে। তবে রুলিংয়ের পরও আপাতত এসব শুল্ক কার্যকর থাকবে বলে আদালত জানিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডি.সি.-ভিত্তিক ফেডারেল সার্কিটের ইউ.এস. কোর্ট অব আপিল সম্প্রতি দেওয়া এক বিভক্ত রায়ে (৭-৪) বিশেষায়িত ইউ.এস. কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (CIT)-এর পূর্ববর্তী রায়কে সমর্থন জানিয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় জরুরি অবস্থার বিধান ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডা, মেক্সিকো, চীনসহ একাধিক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর শুল্ক আরোপ করে সংবিধানবিরোধীভাবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
রায়ে বলা হয়, ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের International Emergency Economic Powers Act (IEEPA)-এর আওতায় যে জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা “আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক” এবং “কংগ্রেস কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে”। আদালতের মতে, IEEPA মূলত জাতীয় নিরাপত্তা বা বৈদেশিক হুমকির ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য প্রণীত হয়েছিল বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের জন্য নয়।
তবে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে এই শুল্ক বাতিলের নির্দেশ দেয়নি। বরং ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত শুল্ক বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ থাকে।
রায়ের পরপরই ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম “Truth Social”-এ এক পোস্টে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন – “সব শুল্ক এখনো কার্যকর আছে। আজ একটি অতিমাত্রায় দলীয় আপিল কোর্ট ভুলভাবে বলেছে যে, আমাদের শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। কিন্তু তারা জানে, আমেরিকা শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।”
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তার প্রশাসনের আরোপিত শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কর্মসংস্থানকে রক্ষা করেছে এবং বিদেশি বাজারে মার্কিন উৎপাদনকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রুলিং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি ও প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সুপ্রিম কোর্ট CIT-এর রুলিং বহাল রাখে, তবে ভবিষ্যতে কোনো প্রেসিডেন্ট সহজে “জাতীয় জরুরি অবস্থা” দেখিয়ে একতরফাভাবে বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ করতে পারবেন না।
কানাডা ও মেক্সিকো ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, “ট্রাম্পের শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।” অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা একে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এখন পুরো বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে গড়ানোর সম্ভাবনা প্রবল। আদালত যদি ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো প্রেসিডেন্ট “জরুরি ক্ষমতা” ব্যবহার করে বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারবেন। আর যদি CIT-এর রায় বহাল থাকে, তবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানিক কাঠামোয় নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ নজির।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব না ফেললেও আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। কারণ, শুল্কনীতি সরাসরি আমদানি-রপ্তানির ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির অংশ হিসেবে আরোপিত শুল্ক নিয়ে এখন আইনি লড়াই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আপাতত শুল্ক কার্যকর থাকলেও, শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক জরুরি ক্ষমতার সীমা কোথায়।
