
অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে অনেক ভোক্তার কাছে নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে “বাই নাউ, পে ল্যাটার” (BNPL) সেবা – যেমন ক্লারনা (Klarna), অ্যাফার্ম (Affirm) বা আফটারপে (Afterpay)। এই সেবাগুলো ক্রেতাদের এখনই কেনাকাটার সুযোগ দেয়, কিন্তু অর্থ পরিশোধের সময়সীমা কিছুটা পরে নির্ধারণ করে। শর্তটি সহজ: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধ করলে কোনো অতিরিক্ত ফি বা সুদ দিতে হয় না। শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে ততটাই জটিল হতে পারে এই ব্যবস্থা।
ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবার অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফ্লেচার বারাগার বলেন, “ব্যবহারকারীবান্ধব করতেই BNPL সেবা আনা হয়েছে। যতটা সম্ভব কম প্রশ্ন করে কেনাকাটা সহজ ও ঝামেলামুক্ত করা এটাই মূল উদ্দেশ্য।” তিনি আরও বলেন, “মানুষ আজকাল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত। তারা দীর্ঘ ক্রেডিট যাচাই প্রক্রিয়া চায় না। তাই BNPL এমন এক বিকল্প, যা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়।” তবে বারাগারের মতে, সমস্যাটা এখানেই। কেনাকাটার এই ‘সহজতা’ অনেক সময় মানুষকে এমন ব্যয়ে ঠেলে দেয়, যা তারা পরে পরিশোধ করতে হিমশিম খায়।
ক্রেডিট কাউন্সেলিং সোসাইটির সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, ২০২৪ সালে ম্যানিটোবার ৪১ শতাংশ বাসিন্দার কাছে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থ পেত। এর মধ্যে “বাই নাউ, পে ল্যাটার” সেবার বিলও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষের ওপর কোনো না কোনোভাবে দেনার চাপ রয়েছে।
সোসাইটির প্রতিনিধি পার্ল ইরাবর বলেন, “জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ। এখন মানুষকে খাবার, পোশাক এমনকি গ্রোসারি কেনাকাটার জন্যও BNPL সেবার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।”
ইরাবরের মতে, এই নির্ভরতা অস্থায়ী নয়, বরং ধীরে ধীরে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। “প্রথমে মানুষ ভাবে, সামান্য সময় নিয়ে পরে বিলটা মিটিয়ে দেবে। কিন্তু একাধিক প্ল্যাটফর্মে একাধিক পেমেন্ট জমে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়,” তিনি সতর্ক করেন।
প্রথাগত ক্রেডিট কার্ডে প্রতি মাসে সুদ ও সার্ভিস ফি থাকে, যা ব্যবহারকারীকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করে। কিন্তু BNPL মডেলে শুরুতে এমন কোনো চাপ নেই। সময়মতো অর্থ পরিশোধ করলে কোনো সমস্যা হয় না। তবে যতক্ষণ না কেউ বিলম্ব করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঝুঁকি ধরা পড়ে না। একবার বিলম্ব ঘটলেই সেই তথ্য ক্রেডিট ব্যুরোতে পৌঁছায় এবং তা ক্রেতার ক্রেডিট স্কোরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, “বাই নাউ, পে ল্যাটার” সেবা বাহ্যিকভাবে সুদমুক্ত হলেও, একবার ফাঁদে পড়লে এর প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, BNPL ব্যবস্থা মানুষের খরচের মানসিকতাকে প্রভাবিত করছে। তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি বা ‘ইনস্ট্যান্ট গ্রাটিফিকেশন’-এর চাহিদা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা নষ্ট করে দিতে পারে। ফ্লেচার বারাগার বলেন, “এটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক একটি খেলা। আপনি এখনই পণ্যটি পেতে পারেন, অথচ অর্থ দিতে হবে পরে এই ধারণাই মানুষকে ভুল নিরাপত্তাবোধ দেয়।”
“বাই নাউ, পে ল্যাটার” নিঃসন্দেহে আধুনিক কেনাকাটাকে দ্রুত ও সহজ করেছে। কিন্তু সহজলভ্য এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় আর্থিক ফাঁদ। অর্থ বিশেষজ্ঞরা তাই পরামর্শ দিচ্ছেন প্রত্যেক কেনাকাটার আগে একটি প্রশ্ন করুন: “আমি কি এখনই এটি সত্যিই দরকার?” কারণ, পেমেন্ট পরে করা গেলেও দায় তো শেষ পর্যন্ত ভোক্তারই।
