
১৯৮৯ সালই হবে। শেরে বাংলা নগর কৃষি কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র । এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে । হঠাৎ একদিন এলান হলো বিকেলের মধ্যে হল খালি করার। আমরা যারা মফস্বল শহর থেকে পড়তে এসেছি তারা পরে গেলাম বিপদে। বাস ট্রেন সব বন্ধ। তার ওপর সন্ধ্যা থেকে ঢাকা শহরে কার্ফু জারি করা হয়েছে। এরুপ পরিস্থিতিতে ঢাকায় থাকার আমার একমাত্র ভরসা বড় ভাই। তিনি চাকুরি করেন বিমান বাহিনীতে, থাকেন ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে। তাঁর বাসায় ফোন করে জানলাম ক্যান্টনমেন্টের ভিতর কোন সিভিলিয়ানকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। জাহাঙ্গীর গেট থেকে সবাইকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এতোটাই ভয়ানক তখন।
আমার খালাতো বোন থাকে মুগদায়। ওর বাসায় কোনদিন যাইনি। ফোন করে পরিস্থিতি জানালাম। ওর বাসায় থাকার জন্য বললো। ঢাকা শহরেও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আগারগাঁও থেকে একটা রিক্সা নিলাম।
এই পরিস্থিতিতে রুমুর আব্বা অনেক করে বললো ওদের বাসায় থাকার জন্য। সমীচীন মনে করলাম না। ওদের বাসায় খেয়ে আবার একটা রিক্সা নিয়ে চললাম মুগদা। মুগদায় কতোদিন থাকতে হবে এবং সময় কিভাবে কাটবে তাও জানি না। আসার সময় রুমু ওদের বাসা থেকে গান শোনার জন্য একটা ওয়াকম্যান দিয়ে দিল সাথে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার রবীন্দ্র সংগীতের একটা ক্যাসেট।
মুগদার খালাতো বোনের বাসায় দোতলার একটা রুমে থাকি। দিনে কিংবা রাতে কোথাও বের হওয়া যায় না। সবসময় ঢুস ঢাস শব্দ বাসা থেকেই শোনা যায়। একদিন সন্ধ্যায় সিগারেট কিনতে বের হয়ে দুগ্রুপের ক্রস ফায়ারে প্রায় পরে গিয়েছিলাম।
সারাদিন সেই রুমে শুয়ে বসে থাকি আর হেডফোন লাগিয়ে ওয়াকম্যানে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার ক্যাসেট উলটে পাল্টে শুনি। সাত দিনে কতবার যে শুনেছি সেই একটি মাত্র ক্যাসেট তা গুনে শেষ করার উপায় ছিলো না।
৮৯ এর সেই আন্দোলনে ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার রবীন্দ্র সঙ্গীতের। তাঁর গানের প্রতি মুগ্ধতা এখনও আছে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গানের শুদ্ধতম শিল্পী আমার তাঁকেই মনে হয়।
সেই রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এসেছেন টরন্টোতে।শেফার্ড এভিনিউ এ তাঁর গানের অনুষ্ঠান ২৩ নভেম্বর রোববার । তাঁর গান শুনতে যাব না এমন তো নয়। কিনবো কিনবো করে একদিন শুনলাম টিকিট সোল্ড আউট। মনটা খারাপ হয়ে গেল।
টরন্টোতে আমার শ্যালিকা মিম্মি শারমিন এর খাজানা কুইন সে অনুষ্ঠানের ফুড পার্টনার । এরুপ পরিস্থিতিতে তার শরনাপন্ন হই। তাকে বলতেই সে বিনামূল্যে সংগ্রহ করে দিলো দুটি টিকেট। এ জন্যেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –
মোটা পণ লালসায় মন ভোরো না
শালী যেথা নেই সেথা বিয়ে করো না।
কানায় কানায় ভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে শিল্পী গান গাইলেন রাত ১০.৩০ পর্যন্ত । ফেরার সময় ড্রাইভ করতে করতেই লেখার প্লট তৈরির চেষ্টা করলাম। সেই প্লটে ধরা দিলো জীবনের মুগ্ধতার এক স্মৃতি, এরশাদ রেজিমে ঢাকার অসহনীয় সময়ের চিত্র। কানে তখনও বাজছিলো রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কন্ঠে রবীন্দ্র সংগীতের শুদ্ধতম সুর।

