
একটা বোমা ফাটাতে চাই। ফাটবে কিনা জানিনা। বোমাটা আমি বানাইনি এবং যারা ফাটাবে সেই আওয়ামী-বিএনপি’র হোমরা চোমরা কাউকে চিনিনা। তাঁরাও কেউ আমাকে চেনে বলে মনে হয় না। কদিন ধরেই জনাব আব্দুল করিম খন্দকারকে নিয়ে নানান রকম কানাঘুষা শুনছি। পক্ষে বিপক্ষে নানা রকমের লেখা পড়ছি। বিপক্ষেই বেশি। কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক কলামিষ্ট সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত মাননীয় সাংসদেরা যা বলছেন মোসাহেবী রাজনীতির অংশ হিসাবে তা নাহয় বাদই দিলাম। কিন্তু সুশীল সমাজের উল্টোসুর দেখে পাল্টা কিছু লিখতে ভীষণ ভয় করছিলো। বড় সমস্যাটি হলো, যে কারণে ভদ্রলোক বিতর্কিত হয়েছেন সেই বই খানার ভেতর বাহির আমার দেখা হয়নি। পক্ষ সমর্থন কিংবা বিপক্ষে যাবার কারণ কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? পরামর্শের জন্য দু’একজন জ্ঞানী বন্ধুর সন্ধান করলাম। কিন্তু মারফিস ল’ অনুযায়ী সময়মতো কাউকেই পাওয়া গেলোনা। তাঁরা সকলেই ব্যস্ত। অগত্যা নিজেই বিতর্কের ঝুঁকি নিয়ে ঘটনাটা লিখতে বসলাম।
মহান মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) এ কে খন্দকার বীর উত্তম। তাঁর সাথে চমৎকার কিছু মুহূর্ত কেটেছিলো আমার। ঘটনার সময়কাল জুলাই ২০০২ থেকে অক্টোবর ২০০৪ এর ভেতর।
এক.
সূত্রপাত সামান্য এক সেলুনে। চুল কাটার সেলুন। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরে রবীন্দ্র সরণীর উপর মার্কেট। সেলুনটা দোতলায়। নাম মনে নাই। তবে শুভ নামে এক হেয়ারড্রেসার কাজ করতো সেখানে। ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকেই ঘন ঘন চুল কাটার বাতিক আমার। ফ্যাশনের জন্য নয় ছোট চুলে আরাম লাগে। শুভর সেলুনে হেয়ারকাট চেয়ার মাত্র চারটি । সে তুলনায় ঘরখানা বেশ বড়। দুটো আলাদা চেম্বার। ঢুকতেই প্রথম চেম্বার কাস্টমারদের ওয়েটিং রুম। এ রুমের ভেতর দিয়েই যেতে হয় হেয়ারড্রেসিং রুমে। চুল কাটার সময় শুভ প্রচুর কথা বলে। ওর বকর বকরে আমি হুঁ হাঁ করি। একদিন আমার চুল কাটতে কাটতে শুভর কথা হঠাৎ থেমে গেলো। একটু তটস্থ হয়ে লম্বা সালাম ঠুকলো ভেতরে আসা কাস্টমারকে। বললো, ‘স্যার, আপনে অয়েটিং রুমে অয়েট করতে থায়েন। এনার শেষ অইলেই আমি আপনারে ডাকতেয়াছি’। বরিশালের টানে একনাগাড়ে বলে গেলো শুভ। ভদ্রলোক ‘ঠিক আছে’ বলে বেরিয়ে গেলেন।
চুলকাটা শেষে পয়সা মিটিয়ে ওয়েটিং রুমে এলাম। একজন কাস্টমারই বসা সেখানে। আড়চোখে দেখলাম। মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান এ কে খন্দকার হোমডেকরের একটা ম্যাগাজিন ধরে আছেন। বড় মাপের মানুষদের সামনে পড়লে দ্রুত সটকে পড়া আমার স্বভাব। পাওনাদার দেখলে ব্যবসায়ীরা যেমন করে। আমিও তাই করলাম।
মাস ছয়েক বাদে একই ঘটনার পুনারাবৃত্তি। এবার একটু চোখের দিক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। ভাবখানা এমন, ‘তুমি কে হে, তোমায় তো চিনিনা’।
দুই.
সাত আট মাস কিংবা বছর খানেকও হতে পারে। কোনো এক শুক্রবারে আমি গেলাম শুভর কাছে চুল কাটতে। মহা ভিড়। ওয়েটিং রুমে মাত্র দুটো সীট খালি। দুটোর মাঝখানে এ কে খন্দকার বসা। মনোযোগ দিয়ে প্রথম আলো পড়ছেন। উপয়ান্তর না দেখে খালি একটাতে চুপ করে বসে পড়লাম। কারো দিক যাতে তাকাতে না হয় সেকারণে একখান ম্যাগাজিন হাতে নিলাম। আবার দ্রুতই ছেড়ে দিলে হলো। প্রচ্ছদে মমতা কুলকার্নির ভীষণ দৃষ্টিকটু ছবি। যেভাবে উল্টানো ছিলো সেভাবেই উল্টে রেখে দিলাম। আর কোনো পেপার খালি নাই। এবার হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় কি? বীর উত্তমের পাশে পায়ের উপর পা তুলে আরামও করতে পারছিনা।
অনেকটা সময় চুপচাপ পার করলাম। একজন মাত্র কাস্টমার ভেতর থেকে বেরুলো। বোরিং লাগছে। হঠাৎ আল্লাহর রহম হলো। মুক্তিবাহিনীর উপ প্রধান পত্রিকাটা নামিয়ে আমাকে বললেন, ‘ভিড়টা আজ বেশিই দেখছি। শুক্রবারটা এভয়েড করে আসা দরকার ছিলো’।
জ্বী স্যার।
স্যার সম্বোধন করেই মনে হলো তাঁকে জানানো উচিত তিনি আমার অতি পরিচিত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। ছেলেবেলা থেকেই তাঁকে আমি চিনি। দেরীতে হলেও সালাম দিলাম। সুযোগ পেয়ে আলাপটাও দীর্ঘ করতে চাইলাম।
তো কেমন আছেন স্যার?
ভালো। তবে বেশি অবসর ভালো লাগেনা।
আপনাকে সকল প্রজন্মই রেসপেক্ট করা। তবে আমাদের প্রজন্ম একটু বেশি করে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের আগ্রহ অনেক প্রবল।
হ্যাঁ, সেটা ভালো। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানছে না।
জানানোর দায়িত্ব তো আপনাদের স্যার।
তা ঠিক।
এবার একটু সাহস করে বললাম, ‘মীর শওকতের মতো গ্রেট মুক্তিযোদ্ধা যদি বলেন ড্রামের উপর দাঁড়িয়ে জিয়া প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন জাতি কার কাছে সঠিক ইতিহাস আশা করবে?’
চট করে আমার দিক তাকিয়ে উনি আমার পেশা জানতে চাইলেন। বললাম, প্রকৌশলী। ‘জিকম ইকুইপমেন্ট’ নামের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করি। প্রসংগক্রমে গ্রামের বাড়ির কথাও উঠলো। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানায় বাঘাবাড়ি এলাকায় বাড়ি শুনে মনে হয় একটু আগ্রহও দেখালেন।
ওই এলাকা আমি চিনি।
হ্যাঁ, আমি জানি আপনি চিনবেন। আপনি আমাদের বৃহত্তর পাবনার গর্ব।
আলোচনা এগোয়। জুমা নামাজের সময় ঘনিয়ে আসায় নতুন কাস্টমার ঘরে ঢোকেনি। পুরনোরা বিদায় নিতে শুরু করেছে। শুভ ফ্রি হলেই ওনাকে ডাকবে। আমাকে বসে থাকতে হবে আরো কিছু সময়। দুজনের খেউরি-কর্মকার যে আবার একই ব্যক্তি!
তিন.
শুভ তাঁকে ডাকার আগ মুহুর্তে বোমফাটানো (?) তথ্যটি তিনি দিলেন। শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন, ওসমানী, ভুট্টো, ইন্দিরা, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ইত্যাদি প্রসঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, সাতই মার্চ ভাষণ শেষে বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন। খুব বেশি অবাক হবার ভান না করে বিশ্বাসের ভঙ্গিতে ঘাড় কাৎ করলাম। ঐ বয়সে না করার মতো কোনো কারণও ছিলোনা। আমার মতো অতি সাধারণ নাগরিককে তিনি কোন রাজনৈতিক স্বার্থে বানানো ইতিহাস বলবেন?
তাছাড়া তথ্যটা দ্বিতীয়বারের মতো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে শুনলাম আমি। প্রথম শুনি প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা সিরাজ সাহেবের কাছে। তিনি সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। বেঁচে আছেন কিনা জানিনা। বেঁচে থাকলে ঢাকার পশ্চিম আগারগাঁওয়ে যেকোনো ব্যক্তি তাঁর বাসা দেখিয়ে দিতে পারবেন। তৎকালীন ১১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি।
পরবর্ত্তিতে কবি শামসুর রাহমান বদরউদ্দিন উমর একই কথা বলেছেন বলে শুনেছি বা পড়েছি। জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান বড় বেমানান। বঙ্গবন্ধু আসলেই বলেছিলেন কি না সেটা নিশ্চিত হওয়া দরকার। আর যদি বলেই থাকেন তাতে তাঁর মর্যাদা হানির বিন্দুমাত্র কারণ দেখিনা। অনেকগুলো রাজনৈতিক, সামরিক ও স্ট্র্যাটেজিক কৌশলে তাঁকে এগোতে হয়েছিলো। আওয়ামীলীগ নেতাদের সে ব্যাখ্যা অবশ্যই জানা থাকার কথা। তথ্য অনুসন্ধান ও গবেষণা না করে একজন সৎ মানুষের লিখিত দলিল প্রত্যাহার বা বই বাতিলের হুমকি কেবল অগণতান্ত্রিকই নয়, চরম বোকামি। লাঠি দিয়ে কলম ঠেকানো যায়না। মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি যা বলেছেন বিশ্বের তাবৎ বাঙালি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছে।
(মন্ট্রিয়ল, কানাডা)
