
এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রম দেখেছি। বেশির ভাগই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর প্রকাশ্যে জনসম্মুখে তেমন বক্তব্য দেননি। কিন্তু এইবার দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দুইজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
আর এবারই দেখা গেলো, অন্তর্বর্তী সরকারের একজন নির্বাচিত সরকারের ক্যাবিনেটে যোগ দিয়েছেন। আরও আছে।
নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী হয়েছেন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অ্যাটর্নি ছিলেন। তিনি অবশ্য অ্যাটর্নি পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি নিজেই একসময় এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এতে সংবিধান কিংবা আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
কিন্তু এরপরেও তো কথা থাকে। তার মানে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অ্যাটর্নি হিসেবে কাজ করছিলেন।
ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি প্রকাশ্যে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের সময় স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার এবং ৭.২ বোরের গুলি সেই সময় কোথা থেকে এসেছিল, ইত্যাদি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও জানিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তগুলি কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ উপদেষ্টাই জানতো না।
এছাড়া দুই দিন আগে রিজওয়ানা হাসান, তিনিও প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, একটি উগ্রবাদী শক্তিকে মেইনস্ট্রিমে আসতে দেননি কিংবা মেইনস্ট্রিম শক্তি হতে দেননি।
আমি তো দেখছি, তারা মেইনস্ট্রিমে এসে গেছে। তারা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পার্লামেন্টে আবির্ভূত হয়েছে। তারা মূলধারার রাজনীতিতে এখন প্রধান দল। যে দলটি আগে ১৫টির বেশি আসন পেত না, এবার তারা পেয়েছে ৭৭টি আসন।
তাহলে প্রশ্ন, মেইনস্ট্রিমের রাজনীতিতে তাদেরকে তিনি আসতে দেননি কীভাবে? তারা তো ইতিমধ্যে এসে গেছে। তার কথার অর্থ যদি দাঁড়ায়, তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি, তবে সেটি অন্য কথা। কিন্তু সেই শক্তিকে মেইনস্ট্রিমে আসতে দেননি—কথাটি ঠিক নয়। বরং তিনি এবং তাদের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকতে তাদেরকে মেইনস্ট্রিমে আসার জন্য সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন।
তাদের ১৮ মাসে যে সমস্ত মব হয়েছিল, কোনোটিই তারা প্রতিহত করেননি। সব নির্বিঘ্নে হতে দিয়েছিলেন। সেই সব মব কারা করতো? তার কথিত সেই উগ্রবাদী শক্তিই তো? আমার জানা মতে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং সেনাবাহিনীতেও সেই সব উগ্রপন্থী সমর্থকদের বসানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই উগ্রবাদী শক্তি আগে কখনোই এত প্রবল শক্তি নিয়ে দেখা দেয়নি।
রিজওয়ানা কি বলতে পারবেন, কোথায় কোথায় তাদেরকে প্রতিহত করা হয়েছিল? আমি তো দেখি না।
যাইহোক, ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছি, উপদেষ্টারা সাধারণত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জনসম্মুখে খুব একটা বক্তব্য দেন না। কারণ তারা শপথ নেওয়ার সময় গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। সরকারে থাকতে তারা কীভাবে, কী কারণে, কী কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—সেগুলো প্রকাশ্যে না আসাই ভালো। প্রকাশ্যে এলে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়।
আরেকজন তো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদটি নিয়ে বলেই দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি হয়েছিল বিএনপি, জামায়াতের সম্মতিতে। কিন্তু কথা হচ্ছে, তিনি কি তার এই বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারবেন? জামায়াত তো তার এই কথা অস্বীকার করেছে। এখন খলিল সাহেব প্রমাণ দিন, জামায়াত মিথ্যা বলছে।
আর এই বিষয়ে বিএনপির চুপ থাকার অর্থ তারা খলিল সাহেবের সেই বক্তব্য অস্বীকার করে না, তার মানে তা তারা মেনে নিয়েছে।
উপরে যে সব কথা উল্লেখ করেছি,সবগুলো বিষয়ের সারসংক্ষেপ করলে কেমন যেন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সব কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
টরন্টো, কানাডা
