
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে ইউরোপে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নরওয়ে সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্তোরে এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নরওয়ের রাজধানী অসলোতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্কটিক অঞ্চল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং মহাকাশ সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি করেছে, তা বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। দুই নেতা একমত হন যে, কানাডা ও নরওয়ে উভয়ই তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। আলোচনায় উঠে আসে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে অতিরিক্ত তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা বাজার স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কানাডা সরকার জানিয়েছে, তারা তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা মধ্যমেয়াদে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সফরের সময় কার্নি নরওয়ের জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বিশেষভাবে আলোচিত হয় নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে একটি বড় তেল প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকের মধ্যে উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, নতুন তেল প্রকল্পের সম্প্রসারণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বৈঠকে আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কার্নির আলাপচারিতায় আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা উঠে আসে। পাশাপাশি আইসল্যান্ডের জ্বালানি খাতের সঙ্গেও সম্ভাব্য অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
নরওয়ে সফরের শুরুতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী দেশটির উত্তরাঞ্চলে অনুষ্ঠিত একটি সামরিক মহড়া পরিদর্শন করেন, যা বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এদিকে দেশে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কর্মসংস্থানে কিছুটা পতন দেখা গেছে। এ বিষয়ে কার্নি বলেন, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে নাগরিকদের সহায়তায় কর সংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে কানাডা ও নরওয়ে যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে, আর্কটিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন, মহাকাশ সহযোগিতা এবং ইউক্রেনকে সহায়তার মতো বিষয়ে তারা ভবিষ্যতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। এছাড়া ইউক্রেন সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে, যা চলতি বছরের শেষ দিকে কানাডার টরন্টো শহরে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
এই বৈঠকটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে পরিবেশগত উদ্বেগ ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
