
কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টোতে পতাকা নীতিকে ঘিরে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশটির পৌর প্রশাসনের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সিটি কাউন্সিল ১৯-৭ ভোটে এমন একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যার ফলে শহরের মিউনিসিপাল ভবনগুলোতে আর কোনো বিদেশি পতাকা উত্তোলন করা হবে না।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাই মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। কয়েক মাস আগে টরন্টো সিটি হলের বাইরে ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। জানা যায়, এক বিক্ষোভকারীকে লাউডস্পিকারে ‘ও কানাডা’ বাজানো বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি প্রতিবাদস্বরূপ ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলন করেন। এই ঘটনাটি শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং পতাকা নীতির পুনর্বিবেচনার দাবি জোরদার হয়।
এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন কাউন্সিলর জন বার্নসাইড। তার প্রস্তাবে শহরের সিটি হল এবং অন্যান্য সিভিক সেন্টারগুলোতে বিদেশি পতাকা উত্তোলনের প্রচলিত রীতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি, শহরের বিদ্যমান পতাকা নীতিমালা পুনরায় পর্যালোচনা করার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া, নাথান ফিলিপিস স্কয়ারে অবস্থিত বৃহৎ ‘টরন্টো’ সাইনের আলোকসজ্জা নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ঘটনার প্রতি সংহতি জানাতে এই সাইনটি বিভিন্ন রঙে আলোকিত করা হতো, যা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
প্রস্তাবটি প্রথমে অলাভজনক ও দাতব্য সংস্থার পতাকা উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা বললেও, পরবর্তীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে : আদিবাসী ও চুক্তির অংশীদার গোষ্ঠীর পতাকা, ইন্টারসেক্স প্রাইড পতাকা, ব্ল্যাক লিবারেশন পতাকা, পেশাদার ক্রীড়া দলের পতাকা এবং শহরের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কর্মসূচির আওতাধীন পতাকা।
এই ব্যতিক্রমগুলো যুক্ত করার মাধ্যমে কাউন্সিল একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিতর্ক এড়ানোর কৌশলও গ্রহণ করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে স্থানীয় সরকারের প্রতীকী অবস্থান নেওয়া নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। অনেকেই মনে করেন, বিদেশি পতাকা উত্তোলন শহর প্রশাসনকে অনিচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ করে তোলে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ বহুসাংস্কৃতিক শহর হিসেবে টরন্টোর পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের যুক্তি, বিভিন্ন দেশের পতাকা উত্তোলন ছিল শহরের বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির প্রতীক।
এই নতুন নীতির বাস্তবায়ন কীভাবে হবে এবং তা ভবিষ্যতে অন্য কানাডীয় শহরগুলোকে প্রভাবিত করবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, কানাডার পৌর প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
