
কানাডায় বিবাহ ও সম্পর্কের বাস্তবতা নিয়ে একটি নতুন সমীক্ষা সমাজের প্রচলিত ধারণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেছে। আর্থিক নিরাপত্তা, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক কাঠামো সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারিত হচ্ছে, যা কেবল আবেগ বা ভালোবাসার ওপর নির্ভর করছে না।
সম্প্রতি এইচঅ্যান্ডআর ব্লক কানাডা পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যদিও অধিকাংশ কানাডিয়ান এখনো বিবাহকে আজীবনের অঙ্গীকার হিসেবে বিশ্বাস করেন, তবুও বাস্তবে অনেকেই সম্পর্ক বজায় রাখার পেছনে অর্থনৈতিক কারণকে বড় ভূমিকা হিসেবে দেখছেন। প্রায় দেড় হাজার অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত এই জরিপে ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বহু মানুষ মূলত আর্থিক সুবিধার কারণে তাদের সঙ্গীর সঙ্গে থাকেন বা আইনি সম্পর্কে আবদ্ধ থাকেন।
সমীক্ষার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সম্পর্কের স্থায়িত্বকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ২৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, যদি তারা লটারি জেতেন এবং ইতোমধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কে থাকেন, তাহলে সঙ্গীর থেকে আলাদা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কুইবেক প্রদেশে এই প্রবণতা তুলনামূলক কম, যেখানে ১৩ শতাংশ মানুষ একই মত প্রকাশ করেছেন। এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত করে যে, আর্থিক অনিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একটি অদৃশ্য চাপ হিসেবে কাজ করে।
তবে এর বিপরীতে, সম্পর্ক ও বিবাহের আদর্শিক ধারণা এখনো শক্তিশালী। ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন যে, বিবাহ মানেই আজীবনের জীবনসঙ্গী। একইসঙ্গে এক-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী আশাবাদী যে তারা জীবনে একজন উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবেন। অর্থাৎ, বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, মানুষের মানসিক কাঠামোয় ভালোবাসা ও স্থায়ী সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।
সমীক্ষায় সম্পর্কের বিকল্প কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। আজীবনের জন্য বিবাহের পরিবর্তে পাঁচ বছর অন্তর অঙ্গীকার নবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হলে ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা এই ধারণাকে সমর্থন করেছেন। এটি আধুনিক সমাজে সম্পর্কের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে নমনীয়তা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সন্তানও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উঠে এসেছে। ৮৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, অনেক দম্পতি মূলত সন্তানের স্বার্থে একসঙ্গে থাকেন। একইসঙ্গে ৪০ শতাংশের মতে, সন্তানের প্রসঙ্গে বিবাহ একটি বাস্তব প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, পারিবারিক কাঠামো এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার তাগিদ অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতাকে ছাপিয়ে যায়।
অর্থনৈতিক সুবিধার প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মতামত উঠে এসেছে। অর্ধেকের বেশি উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন, বিবাহিত দম্পতিরা একক ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি কর সুবিধা পান। এই বৈষম্যের কারণে ৬৩ শতাংশ কানাডিয়ান মনে করেন, সিঙ্গেল ব্যক্তিদের জন্য আরও বেশি কর অব্যাহতি থাকা উচিত, কারণ তারা ব্যয়ের ভার ভাগাভাগি করার সুযোগ পান না।
সব মিলিয়ে এই সমীক্ষা দেখায় যে, কানাডার সমাজে সম্পর্ক ও বিবাহ এখন আর কেবল আবেগ বা সামাজিক রীতিনীতির ওপর নির্ভর করছে না। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সন্তান এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালা—সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কের কাঠামো নতুনভাবে গড়ে উঠছে। ফলে আধুনিক যুগে বিবাহের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
