
কানাডার অন্টারিও রাজনীতিতে আবারও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চলেছেন সাবেক ফেডারেল লিবারেল মন্ত্রী নবদীপ বেইন্স। দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং কর্পোরেট খাতে উচ্চপদে কাজ করার পর এবার তিনি অন্টারিও লিবারেল পার্টির (ওএলপি) নেতৃত্বের লড়াইয়ে নাম লিখিয়েছেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের প্রার্থিতার ঘোষণা দেন।
মাত্র ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওটির শিরোনাম ছিল “লেট’স গেট টু ওয়ার্ক”। ভিডিওতে দেখা যায়, বেইন্স একটি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছেন, তারপর একটি চেয়ারে বসে নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে নিচ্ছেন। একই সময়ে পেছনে স্কুলের ঘণ্টা বাজছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি নতুন করে কাজ শুরু করা, দায়িত্ব নেওয়া এবং পরিবর্তনের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
৪৮ বছর বয়সী নবদীপ বেইন্সের জন্ম টরন্টোতে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কানাডার লিবারেল রাজনীতির পরিচিত মুখ হিসেবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি কর্পোরেট জগতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সর্বশেষ তিনি কানাডার অন্যতম বৃহৎ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান রজার্স কমিউনিকেশন্সে চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দিয়েছেন। সিটিভি নিউজ টরন্টোর সাংবাদিক সিওভান মরিসকে রজার্স কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, ৮ মে থেকেই তার পদত্যাগ কার্যকর হয়েছে।
বেইন্সের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় ফেডারেল রাজনীতিতে। ২০০৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো মিসিসোগা-ব্র্যাম্পটন সাউথ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ওই এলাকার এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৫ সালে তিনি আবারও রাজনীতিতে ফিরে এসে মিসিসোগা-মল্টন আসন থেকে জয়ী হন এবং ২০২১ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মন্ত্রিসভায় তিনি ইনোভেশন, সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে কানাডার প্রযুক্তি খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে তার উদ্যোগ আলোচনায় আসে।
অন্টারিও লিবারেল পার্টির বর্তমান বাস্তবতায় বেইন্সের প্রার্থিতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটি প্রাদেশিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞ এবং জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত একজন নেতাকে সামনে আনা দলটির জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতা সহজ হবে না। ইতোমধ্যে ইটোবিকোক-লেকশোরের বর্তমান এমপিপি লি ফেয়ারক্লফ নেতৃত্বের দৌড়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। পাশাপাশি সাবেক নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক কর্মী ডিলান মারান্ডোও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আগামী কয়েক মাসে অন্টারিও লিবারেল পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বেইন্সের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যবসায়িক সংযোগ। একই সঙ্গে তিনি বহুসাংস্কৃতিক ভোটারদের মধ্যেও পরিচিত মুখ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা দলীয় রাজনীতিতে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।
অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ফেডারেল রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে প্রাদেশিক রাজনীতির বাস্তবতা এবং স্থানীয় ইস্যুগুলোর সঙ্গে তাকে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় এসব বিষয় এখন অন্টারিও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ফলে শুধু পরিচিতি নয়, বরং এসব ইস্যুতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরাও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
নবদীপ বেইন্সের নেতৃত্বের দৌড়ে নামা অন্টারিওর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, তিনি কি তার অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দলকে নতুন নেতৃত্ব দিতে পারেন, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চ্যালেঞ্জে তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে।
