
গাজায় প্রতীকী ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা আন্তর্জাতিক ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া কানাডিয়ান নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর ‘নির্মম নিপীড়নের’ অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কানাডা সরকার। শুক্রবার কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ জানান, তুরস্কে পৌঁছানো কানাডিয়ান যাত্রীদের কাছ থেকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন তিনি এবং আহতদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আনান্দ বলেন, “গ্লোবাল সামুদ ফ্লোটিলার ১২ জন কানাডিয়ান যাত্রী নিরাপদে তুরস্কে পৌঁছেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে জরুরি চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ইসরায়েলে কানাডিয়ানদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানাচ্ছে কানাডা। এই নিপীড়নের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।” তবে কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ওই নাগরিকরা, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্যদিকে, ইসরায়েলের কারা কর্তৃপক্ষও বন্দিদের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবে আটক কানাডিয়ান নাগরিকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চিত্র। ফ্লোটিলার অন্যতম যাত্রী সাফা শেবি, যিনি চার দিন ইসরায়েলের একটি কারাগারে আটক ছিলেন, জানান তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সাফা শেবির ভাষ্য অনুযায়ী, আটক করার সময় ইসরায়েলি বাহিনী তার বুকে লক্ষ্য করে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে তিনি আহত হন। তার হাঁটু ও কপালে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া তার হিজাব খুলে নেওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় হাত বাঁধা অবস্থায় থাকতে বাধ্য করা হয়। তিনি আরও বলেন, “আমাদের এমন একটি অন্ধকার জায়গায় রাখা হয়েছিল যেখানে কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। হাত বাঁধা অবস্থাতেই ঘুমাতে বাধ্য করা হয়। আটক হওয়ার পর প্রায় দুই দিন একটি জাহাজে বন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে।” পরবর্তীতে তাকে ইসরায়েলের একটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, বন্দিদের অনেকের পোশাক খুলে নেওয়া হয়েছিল এবং ঠান্ডা রাতে মাত্র এক স্তরের পোশাকে থাকতে বাধ্য করা হয়। সাফা শেবি বলেন, “কারাগারের ভেতরে দিনগুলো আরও বেশি সহিংস ছিল। আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে যেন আমরা কোনো অপরাধী, অথচ আমরা শুধু মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম।”
উল্লেখ্য, গাজায় চলমান মানবিক সংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতীকী ত্রাণ নিয়ে সমুদ্রপথে গাজায় প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। এই অভিযানে অংশ নেয় ৪১টি বোট এবং প্রায় ৪২০ জন আন্তর্জাতিক নাগরিক। তবে গাজামুখী বহরটি ইসরায়েলি বাহিনী আটকে দেয় এবং অংশগ্রহণকারীদের আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ১২ জন কানাডিয়ান নাগরিকও।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজে অভিযান এবং পরবর্তী আটক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েল বরাবরের মতো দাবি করছে, গাজায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ এবং সন্দেহজনক কোনো নৌযানকে তারা বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে।
এই ঘটনার ফলে ইসরায়েল ও কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্কে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনার মাত্রাও আরও বাড়তে পারে।
