
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের যুগে উন্নত এআই মডেলের প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি। এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সতর্ক করে বলেছেন, সীমিত সংখ্যক মার্কিন প্রযুক্তি সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রোববার এক বক্তব্যে কার্নি বলেন, এআই কোম্পানি অ্যান্থ্রপিকের সর্বশেষ মডেল “ফ্যাবল ৫” এবং “মাইথোস ৫”-এর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বর্তমান প্রযুক্তি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, বিশ্বের অনেক দেশ এবং প্রতিষ্ঠান বর্তমানে অল্প কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানির তৈরি অত্যাধুনিক এআই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
গত শুক্রবার এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যান্থ্রপিক ঘোষণা করে যে তারা তাদের নতুন মডেল ফ্যাবল ৫ এবং মাইথোস ৫-এর আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নির্দেশিকা মেনে চলতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন নীতির আওতায় কিছু উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বিদেশি নাগরিক এবং বিদেশভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি সামরিক, সাইবার নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় এর ব্যবহার ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
অ্যান্থ্রপিকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফ্যাবল ৫ মূলত মাইথোস ৫-এর একটি তুলনামূলক সীমিত সংস্করণ। অন্যদিকে, মাইথোস ৫ কোম্পানির সবচেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী এআই মডেলগুলোর মধ্যে অন্যতম। সাইবার নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কারণে মাইথোস ৫-এর ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্ক কার্নি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্বের প্রযুক্তি খাত কতটা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, “মাইথোস এবং ফ্যাবলকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত নির্দিষ্ট কিছু মডেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফল। এখানে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করেনি। কিন্তু আমরা যদি এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা না নিই, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।” তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি খাতে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে গবেষণা, উন্নয়ন এবং বিকল্প প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
এআই প্রযুক্তি এখন শুধু বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নত অর্থনীতিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব ধরে রাখতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নত এআই মডেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে অনেকেই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে উন্নত এআই প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনা শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ নিজস্ব এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেবে।
কার্নি জানান, ফ্রান্সের এভিয়ান-লেস-বেইন্সে অনুষ্ঠিতব্য জি৭ সম্মেলনের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসবে। বিশ্ব নেতারা এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবেন। জি৭ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে বৈশ্বিক এআই নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা এখন বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অ্যান্থ্রপিকের নতুন মডেলের ওপর বিধিনিষেধ এবং মার্ক কার্নির মন্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে বিশ্ব কি কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? এআই প্রযুক্তি যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, ততই এর নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার এবং বৈচিত্র্য নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং প্রযুক্তি খাতে বহুমুখী উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
