সামাজিক মাধ্যম ও এআই নীতি নিয়ে যা জানা প্রয়োজন

Two men pose for a photo in a brick-walled venue with blue lighting; the man on the left wears a white shirt with sunglasses hanging from his chest, while the man on the right wears a rainbow Pride sash and glasses.
এআই মিনিস্টার ইভান সোলেমান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে একগুচ্ছ যুগান্তকারী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে কানাডার লিবারেল সরকার। সদ্য সমাপ্ত দুই সপ্তাহের সংসদীয় অধিবেশনে সরকার এমন কয়েকটি বিল উত্থাপন করেছে, যা কার্যকর হলে কানাডার ডিজিটাল নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সরকারের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া কনটেন্ট, ডিপফেক এবং শিশুদের অনলাইন ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই নতুন আইনগুলো আনা হয়েছে।

গত ১০ জুন সংসদে উত্থাপিত বিল সি-৩৪ অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ ঠেকাতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, এক্সসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বয়স যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি চালু করতে হবে। তবে সরকার একটি ব্যতিক্রমের সুযোগও রেখেছে। যদি কোনো প্ল্যাটফর্ম শিশুদের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে তারা এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে বয়স যাচাই হবে কিংবা কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পর্যাপ্ত হিসেবে গণ্য করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নীতিমালা তৈরি হয়নি।

- Advertisement -

নতুন ডিজিটাল সেফটি বিল কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, এআইভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন দায়িত্বের আওতায় আনছে। সরকার চায়, এআই চ্যাটবট ও অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করুক। বিশেষ করে ভুল তথ্য ছড়ানো, ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত কিংবা ব্যবহারকারীর ক্ষতি হতে পারে এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর স্পষ্ট দায়িত্ব আরোপ করা হবে।

১৫ জুন সংসদে উত্থাপিত বিল সি-৩৬-কে কানাডার ডিজিটাল গোপনীয়তা সুরক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিলের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে কানাডার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাকে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় বা এআইভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে স্বচ্ছ থাকতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি অ্যালগরিদম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নেওয়া হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি সম্পর্কে ব্যবহারকারীকে জানাতে হবে।

নতুন গোপনীয়তা আইনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো “রাইট টু ডিলিট” বা তথ্য মুছে ফেলার অধিকার। এই বিধান কার্যকর হলে কোনো ব্যক্তি চাইলে লিখিতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে তার ব্যক্তিগত তথ্য স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার আবেদন করতে পারবেন। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সেই তথ্য মুছে ফেলতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআরের মতো এই ব্যবস্থা কানাডার নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেবে।

ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতেও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ সপ্তাহেই সংসদে পৃথক একটি আইন পাস হয়েছে, যেখানে বিনা অনুমতিতে যৌনধর্মী ডিপফেক তৈরি বা প্রচারকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে, আইনের প্রাথমিক খসড়ায় কিছু প্রযুক্তিগত ফাঁক ছিল। বিশেষ করে ইলোন মাস্কের মালিকানাধীন এক্স প্ল্যাটফর্মের গ্রোক চ্যাটবটের মাধ্যমে তৈরি কিছু কৃত্রিম ছবি হয়তো আইনের আওতায় নাও আসতে পারে। এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে হাউস অব কমন্সের একটি কমিটি বিল সি-১৬ সংশোধন করে। সংশোধিত আইনে শুধু সম্পূর্ণ নগ্ন নয়, প্রায় নগ্ন বা আংশিক যৌনধর্মী ডিপফেক ছবিও অপরাধের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ডিজিটাল সেফটি বিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। আইন কার্যকর হলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে অভিযোগ পাওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত দুটি ধরনের কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে : শিশুদের যৌন নির্যাতনের সঙ্গে সম্পর্কিত বা ভুক্তভোগীদের পুনরায় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে এমন কনটেন্ট। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া প্রকাশিত অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও। সরকারের মতে, অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই বিধানের উদ্দেশ্য।

উভয় বিলেই একটি নতুন ডিজিটাল নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সংস্থা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন মেনে চলা তদারকি করবে, অভিযোগ তদন্ত করবে এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। এতদিন কানাডায় ডিজিটাল খাতে একাধিক সংস্থা দায়িত্ব পালন করলেও নতুন কাঠামো তদারকি আরও কার্যকর করতে পারে।

যদিও সংসদে বিলগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে এগুলো এখনই আইনে পরিণত হচ্ছে না। সংসদ গ্রীষ্মকালীন বিরতিতে যাওয়ায় আগামী ২১ সেপ্টেম্বর শরৎকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হবে না। এরপর বিলগুলোকে সংসদীয় কমিটির বিস্তারিত পর্যালোচনা, হাউস অব কমন্স ও সিনেটের অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ডিজিটাল সেফটি আইন বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিসভাকে পৃথক বাস্তবায়ন নির্দেশিকাও জারি করতে হবে। সরকারি সূত্রের ধারণা, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগতে পারে। ফলে ২০২৮ সালের আগে এসব আইন পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কানাডা ডিজিটাল খাতে বড় ধরনের নীতিগত সংস্কারের পথে হাঁটছে। এই আইনগুলো কার্যকর হলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি বাড়বে, নাগরিকরা নিজেদের তথ্যের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পাবেন এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তি খাতের অনেকেই মনে করছেন, এসব আইনের বাস্তব প্রয়োগ, বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Read More

Recent