
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর বসন্ত ও শরৎকালে ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ বাতিলের উদ্যোগ নতুন গতি পেয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সম্প্রতি একটি বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছে, যার মাধ্যমে বছরে দুইবার সময় পরিবর্তনের নিয়ম তুলে দিয়ে সারা বছর একই সময় ডেলাইট সেভিং টাইম চালু রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন বিলটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন সিনেটে পাঠানো হবে। এই অগ্রগতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, প্রতিবেশী কানাডাতেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ দুই দেশের অর্থনীতি, পরিবহন, বাণিজ্য এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থায়ীভাবে সময় পরিবর্তনের প্রথা বাতিল করে, তাহলে কানাডার ওপরও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার বেশিরভাগ অঞ্চলেই বছরে দু’বার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করা হয়। বসন্তকালে ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সন্ধ্যায় বেশি সময় প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যায়। আবার শরৎকালে সেই এক ঘণ্টা পিছিয়ে এনে আগের সময়সূচিতে ফেরা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়াই বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ একবার সময় নির্ধারণ করার পর সারা বছর আর ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করতে হবে না। এই পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি হলো, বছরে দু’বার সময় বদলের কারণে মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়, কর্মক্ষমতায় প্রভাব পড়ে এবং অনেকের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দেখা দেয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সময় পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
যদিও কানাডার কিছু প্রদেশ ইতোমধ্যে স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম চালুর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে, তবুও এখন পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ অংশেই আগের নিয়মই কার্যকর রয়েছে। ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার গ্রায়েফের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই বিলকে আইনে পরিণত করে, তাহলে কানাডার জন্যও একই পথ অনুসরণ করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত হবে। তার ভাষায়, দুই দেশের সময়ের পার্থক্য স্থায়ীভাবে বদলে গেলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিমান ও রেল যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি সমন্বয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই কানাডা হয়তো প্রথমে কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাস্তব সমস্যা দেখা দেয় কি না, সেটিও মূল্যায়ন করবে। এরপর নিজেদের অবস্থান চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সময় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার নজির নতুন নয়। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডেলাইট সেভিং টাইমের সময়সীমা কয়েক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন কানাডার বিভিন্ন প্রদেশও দ্রুত একই ধরনের পরিবর্তন কার্যকর করে, যাতে দুই দেশের সময়সূচির মধ্যে অপ্রয়োজনীয় পার্থক্য তৈরি না হয়। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগাভাগি করা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানুষ, পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান হয়। সীমান্তবর্তী শহরগুলোর বাসিন্দাদের অনেকেই এক দেশে বসবাস করলেও অন্য দেশে কাজ করেন। এছাড়া ব্যাংকিং, শেয়ারবাজার, বিমান চলাচল, ট্রাক পরিবহন, টেলিযোগাযোগ এবং অনলাইন সেবার ক্ষেত্রেও সময়ের সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি দেশ বছরে দুইবার সময় পরিবর্তন করে এবং অন্যটি তা না করে, তাহলে কয়েক মাসের জন্য দুই দেশের সময়ের ব্যবধান বদলে যাবে, যা বিভিন্ন খাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বিষয়টি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হলেও এটি এখন সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিনেটে বিলটি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে এবং সেখানে কিছু বাধার মুখেও পড়তে পারে। সিনেটে অনুমোদন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই কেবল যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুইবার ঘড়ি পরিবর্তনের বহু বছরের প্রথার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটবে।
যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর কানাডার প্রদেশগুলোও নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে। কারণ দুই দেশের সময়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখা শুধু প্রশাসনিক নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আগামী কয়েক মাসে শুধু ওয়াশিংটন নয়, অটোয়ার দিকেও নজর থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থায়ী ডেলাইট সেভিং টাইম কার্যকর করে, তাহলে কানাডাও একই পথে হাঁটবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তরই হবে উত্তর আমেরিকার সময় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম বড় বিষয়।
