বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দুষ্প্রাপ্য ভিডিও ফুটেজ!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

অতি সম্প্রতি একটা ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেই ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে বিশাল দেহের বঙ্গবন্ধু মাথাটা নিচু করে আমার নাগালের মধ্যে এনে দিচ্ছেন আর আমি তাঁর মাথায় পরিয়ে দিচ্ছি ক্যাপ। তিনি আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন। তাঁর বিখ্যাত তর্জনীটি আমার দিকে তাক করে কথা বলছেন হাস্যোজ্জ্বল মুখে। ছোট্ট বালক আমি একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে খুব হাসিখুশি ভঙ্গিতে কথা বলছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, আই কন্ট্যাক্টে। আমাদের কথোপকথন শুনে হাসছেন দাদাভাই এবং সুফিয়া কামালও। অপরূপ হাসিমুখে সুফিয়া কামাল হাততালি দিচ্ছেন। একটা অসাধারণ ফ্রেম। সেই ফ্রেমে বঙ্গবন্ধুসহ আমরা সকলেই হাস্যোজ্জ্বল। আহা কী গৌরব-সঞ্চারি একটা দৃশ্য। আমার সারা জীবনের এক অনন্য প্রাপ্তি এই ভিডিও ফুটেজটি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কুমার বিশ্বজিতের একটি গানে এই ফুটেজটি ব্যবহার করা হয়েছে। যা প্রচারিত হয়েছে চ্যানেল আইতে। গানটাও হয়েছে অসাধারণ, কথায় সুরে আর গায়কীতে।
ছেচল্লিশ বছর আগের, ১৯৭৪ সালের এই দুষ্প্রাপ্য ভিডিও ফুটেজটির খবর প্রথম আমাকে দিয়েছে চ্যানেল আই-এর অনুষ্ঠান প্রযোজক শওকত আলী। ফেব্রুয়ারির বইমেলা চলাকালীন এক বিকেলে চ্যানেল আই ভবনে আমাকে পেয়েই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিলো শওকত–আম্‌নের লগে বঙ্গবন্ধুর স্টিল ফটোগ্রাফি আম্‌নের লেখায় বইতে দেইখছি এতোদিন। বঙ্গবধু স্যালুট নিতেছেন আর ছোট্ট পিচ্চি আম্‌নে সুফিয়া কামাল-দাদাভাইয়ের লগে দাঁড়াইয়া আছেন। সেই ঘটনার ভিডিও দেইখছেন্নি?
আমি বললাম, না তো! ভিডিও তো দেখিনি।
–আঁই দেইখচি! বঙ্গবন্ধুরে লই কুমার বিশ্বজিতের একটা গান এডিটিং চইলতেছিলো। আমি আম্‌নেরে চিনি ফালাই চিৎকার কইচ্ছি। হ্যার পর রিওয়াইন্ড ফরোয়ার্ড করি সবতে মিলি আমরা আম্‌নেরে দেইখচি!
আরে তাই নাকি? এই ভিডিও ফুটেজ কোত্থেকে আবিস্কৃত হলো? মনে হয় ডিএফপিতে ছিলো। ছেচল্লিশ বছর পর পাওয়া গেছে!
সাগর ভাইকে ঘটনা বললাম। সাগর ভাই তখনো প্রচার না হওয়া গানটা আনিয়ে তাঁর কক্ষে বসে দেখলেন। আমার সঙ্গে দৃশ্যটা পর্দায় ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সাগর ভাই বললেন–অই যে রিটন।
অন্যান্যের সঙ্গে বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস আরাও ছিলেন সেখানে। তিনিও অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখলেন। সাগর ভাই চ্যানেল আইয়ের কর্মী আইটি বিশেষজ্ঞ সাব্বিরকে বললেন চলমান ছবি থেকে ফ্রিজ করে করে কয়েকটা স্থিরচিত্র আমাকে দেবার জন্যে। বেশ কয়েকটা অসাধারণ স্থিরচিত্র পেয়ে গেলাম সাগর ভাইয়ের কল্যাণে।
এই ছবিগুলো সেই স্থিরচিত্র সিরিজের।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার এই দ্বিতীয় সাক্ষাতের ঘটনাটা বাংলাদেশ টেলিভিশনের খবর ছাড়াও সিনেমা হলগুলোতে দেখানো হয়েছিলো। সে আরেক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা ছিলো আমার জীবনে।
তখন, ১৯৭৪ সালে, বাংলাদেশের সিনেমাহলগুলোতে সিনেমা শুরু হবার আগে ‘চিত্রে বাংলাদেশের খবর’ নামে একটা সেগমেন্ট প্রচারিত হতো। বঙ্গবন্ধুর মাথায় আমি কচি-কাঁচার মেলার ক্যাপ পরিয়ে দিচ্ছি, তিনি নিচু হয়ে ঝুঁকে আমাকে সহায়তা করছেন, ক্লোজ শটে এই দৃশ্যটি ‘চিত্রে বাংলাদেশের খবরে’ বহুদিন দেখানো হয়েছিলো। গমগমে ভরাট হিরন্ময় কণ্ঠে এই খবর পাঠ করেছিলেন বিখ্যাত সংবাদ পাঠক সরকার কবির উদ্দিন। মধুমিতা সিনেমা হলের বিরাট পর্দায় সেই দৃশ্য আমাকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন অগ্রজ এটিএম মিজানুর রহমান। আহা কী মধুর সেই দৃশ্য! কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যটা দেখার জন্যে সিনেমার দু’টি টিকিট কিনতে হয়েছিলো আমার অগ্রজকে। বাড়তি পাওনা হিশেবে সেদিন কোন সিনেমাটা দেখেছিলাম সেটা আজ মনে নেই। তবে সিনেমার বড় পর্দায় শাদাকালো ঝকঝকে চলমান ছবিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে নিজেকে অবলোকনের সেই স্মৃতিটা আমার মস্তিষ্কে মুদ্রিত হয়ে আছে স্থায়ীভাবে।
লেখক গবেষক শামসুজ্জামান খানের পরামর্শে আমি একটি বই লিখছি। বইয়ের নাম–”আমার শৈশব আমার বঙ্গবন্ধু”। মুজিববর্ষে বইটা বেরুবে বাতিঘর থেকে।

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent