চিকিৎসাশাস্ত্রে গবেষণা

ছবিম্যাকগিল

আমাদের সৌভাগ্য কোভিড-১৯ মহামারির পূর্বেই গবেষকগণ টীকা প্রয়োগের প্রযুক্তি নিয়ে অসাধারণ অগ্রগতি দেখিয়েছেন। গতানুগতিক টীকা সাধারণত কোন মৃত বা কম বলশালী ভাইরাস শরীরে প্রবর্তন করে দেয়া হয়, যারা বুঝতে পারে আমাদের শরীরে রোগজীবানুর আকৃতি প্রকৃতি এবং বলশালী ঐ জাতিয় ভাইরাস আক্রমন হলে তাকে বাধা দেয়। তবে এখন গবেষকগণ নতুন ধরনের প্রতিষেধক জেনে নিয়েছেন যাতে ভাইরাস শরীরে প্রবর্তনের কাল ক্ষেপনের আর প্রয়োজন হবে না। পরিবর্তে mRNA মলিকুল জেনেটিক কোডের দ্বারা আমাদের শরীরে কোন নতুন ভাইরাস সনাক্ত হলে প্রোটিনকে প্রতিষেধক তৈরী করতে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশ দিবে। ঐতিহ্যগত টীকার (ভেক্সিন) চাইতে এটি অনেক দ্রুত কাজ করবে, এমন ভাবনা বিজ্ঞানীদের। তারা আশা করছেন ২০২১ সালের মাঝে এধরনের ভেক্সিন বাজারজাত হবে, যদি তাই ঘটে সেটি হবে বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক বিজয় ও কীর্তি।
টীকার জগতে এই অগ্রগতি ছাড়াও বর্তমান মহামারি উদ্ভুত পরিস্থিতির আলোকে চিকিৎসাশাস্ত্রের আরো দুটি বিশাল সাফল্য-অর্জনের প্রত্যাশা বিজ্ঞানীদের। প্রথমটি হবে পীড়ার কারণ-তত্ত্বের সহজ অনুসন্ধান। আগামীদিনে মারাত্মক কোন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটলে সম্ভবত আমরা প্রতি ঘরে ঘরে নিজেরাই পরীক্ষা করে জানতে পারব, যেমনটা সহজ ভাবে আজকাল গর্ভাবস্থা নির্ণয় করা যায়। দ্বিতীয়টি হবে সংক্রামক রোগাদির জীবানু-নিবারক ভেষজ বা ঔষধ। বিজ্ঞানের এই ক্ষেত্র গুলোতে টাকার লগ্নি বা বিনিয়োগ অতীতে সামান্যই হয়েছে। এককোষী ব্যাক্টিরিয়া নিবারণে যতটা ঔষধ আবিষ্কার হয়েছে ( যথা যে কোন এ্যান্টিবায়টিক ) সে তুলনায় ব্যাক্টিরিয়ার চাইতে ক্ষুদ্রতর এই ভাইরাসের নিবারণে তেমন কোন ঔষধ আজও নেই। তবে আজ তা পরিবর্তিত হতে চলছে, আশাকরা যাচ্ছে গবেষকগণ অবিলম্বে করোনা ভাইরাস নিরাময়ে ফলপ্রদ ও কার্যকর ঔষধ বাজারে আনতে সক্ষম হবেন।
উল্লিখিত তিনটি প্রযুক্তি আগামীদিনে আমাদের যেকোন মহামারি থেকে সুরক্ষা বা পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাসময়ের পূর্বেই সহায়তা দিতে সাহায্য করবে। বিজ্ঞানীরা কিছুদিন যাবৎ এও ভাবছেন mRNA জাতিয় ভেক্সিন হয়ত বা পরিণামে কেনছার( Cancer ) প্রতিরোধেও সম্ভাব্য ভেক্সিন স্বরূপ আসতে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারির ফলে বিজ্ঞান বিশেষ করে চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক গবেষণার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ এবং আস্তা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে দ্রুত, প্রত্যক্ষভাবে কোন উদ্ভাবনের আশায় বা ভবিষ্যতের প্রস্তুতি ও আয়োজনের সংকল্পে। ছাত্ররা অধিক সংখ্যায় আজ ভাবছে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা সাড়া জাগানো ও ফলপ্রসূ উচ্চমানের পেশা হতেপারে, তাই মেধাবী ছাত্ররা সেদিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ সব সময়ই উপেক্ষিত ছিল, কোভিড-১৯ এর পর সেই দৃষ্টিভঙ্গীর আমূল পরিবর্তণ বিবেচনায় এসেছে, এখন প্রত্যেক দেশকেই ভাবতে হচ্ছে স্বাস্থ্য-সেবার মান উন্নয়ন করা কতটা জরুরী । স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য-সম্মত জীবন ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অনুন্নত ও দরিদ্র দেশে মানুষের অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও কুসংস্কার স্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বড় প্রতিবন্ধকতা। স্বাস্থ্যখাতে আরও অধিক ব্যয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং সব প্রতিবন্ধকতা দূরকরা যে কোন দেশেই সরকারের দায়িত্ব, এ বিষয়টি এখন সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
করোনা ভাইরাসের বিবর্তন, জীব পরজীবীকে আশ্রয় করে সংক্রমন এবং বংশানুগতির তথ্য ও ব্যাধির মাঝে আদান প্রদানের জ্ঞান লাভ করতে জীববিজ্ঞানীগণ আজ প্রবল আকাঙ্খানিয়ে কাজ করছেন। যদি অজ্ঞানতা, ভয় এ সব দূর করে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে জনমনে বিশ্বাস যোগ্যতা আনা যায় তবে জনসাধারনের দীর্ঘ মেয়াদী অতীত আচরণ ও মনোভাবের পরিবর্তণ ঘটবে, সাথে সাথে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আশানুরূপ উদ্বোদ্ধ হবে।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যোগাযোগ, আদান প্রদান, প্রসার ও ব্যপ্তি অতি দ্রুত পরিবর্তীত হচ্ছে। আপাতপ্রতিয়মান সব চাইতে বড় দিক হচ্ছে গবেষণা প্রকাশন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি প্রবাদ রয়েছে, “বিজ্ঞান প্রকাশনায় না আসলে তার অস্তিত্ব নাই”। কারণ যে কোন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন আলোচনা, বিভিন্ন বিজ্ঞানীর বিচারবিবেচনা সাপেক্ষেই গ্রহণযোগ্য হতে হয়।
এখন করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের লক্ষ্যে ২৫০ টির অধিক উদ্ভাবন-পরীক্ষার্থী, হাসপাতালের শয্যাপার্শ্বে পরীক্ষা নিরীক্ষায় ব্যস্ত। তার চাইতেও অধিক সংখ্যক উদ্ভাবন পর্যাযের প্রায় শেষ প্রান্তে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে হাসপাতাল, ঔষধ কোম্পানি, পান্ডিত্যপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও বিজ্ঞানীদের যৌথ সহযোগিতার ফলে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে বহুমাত্রিক প্রচারিত উদ্ভাবন-পরীক্ষার্থী ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনার ইনষ্টিটিউট, যারা ইদানিং পরীক্ষাপ্রক্রিয়া চালিয়েছে।এই প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে ঔষধ কোম্পানির সাথে ভেক্সিনের ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদনের প্রয়াসে কাজ করে যাচ্ছেন।এ ব্যাপারে তথ্য উপস্থাপন ও ভেক্সিনের কার্যকারিতার প্রমানসহ বিতরণ শুধু স্বল্প সময়ের অপেক্ষা।
এ ধরণের সহযোগিতা নিয়ে উদ্ভাবন দেশবিদেশের সীমানা ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তদ্ব্যতীত বিপদ মাত্র এক যায়গায় যে রাজনেতাদের বিজ্ঞান ও তার অগ্রগতিতে হস্তক্ষেপ। আমেরিকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় অর্থ লগনি সঙ্কুচিত করা এমন কী সদস্যপদ প্রত্যাহারের ধমক অপ্রত্যাশিত, তাই বিজ্ঞান বিষয়ক কুটনীতির নবজীবন প্রাপ্তির আশায় বিজ্ঞানীরা এখন উদ্যোগী হচ্ছেন।
অবশেষে যেদিন ভেক্সিন জনগনের হাতে পৌঁছে যাবে কোভিড-১৯ মহামারির সংকটকাল পেরিয়ে বিশ্ববাসী করোনাকে জয় করবে, আজকের দুর্বিসহ ঘটনাবলী হবে কেবল মাত্র সকলের দুঃখ দৈন্যের স্মৃতি। নবীন যে দিন আসবে স্বাগত জানিয়ে আমরা বলব “এ তো নতুন ভিন্নতর আর এক জগৎ”।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আজ বিশ্ববাসীর আশার আলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি তাদের জন্য বিশেষ প্রেরণা বলে তারাও অবিরাম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন অপ্রতিরুদ্ধ গতিতে। করোনা সম্পর্কিত সকল তথ্যাবলী যথা সম্ভব দ্রুত প্রকাশ করতে তারা আগ্রহী এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশের নিয়মানুবর্তিতার সাথে সহযোগিতা করে গবেষকগণ এগিয়ে চলছেন। বিজ্ঞানীদের উপর জনমনে বিশ্বস্তভাবে নির্ভরযোগ্যতার এক নুতন যুগ উদ্ভুত হতে চলছে।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent