বীমা দাবিতে ৮.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে কানাডা

২০২৪ সালের মাত্র প্রথম ছয় মাসেই ঝড় শিলাবৃষ্টি বন্যা ও দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৮৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি

কানাডা এ বছর চরম আবহাওয়ার এক নজিরবিহীন ধাক্কা সামলাচ্ছে। ২০২৪ সালের মাত্র প্রথম ছয় মাসেই ঝড়, শিলাবৃষ্টি, বন্যা ও দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৮.৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি। বীমা শিল্পের তথ্যানুযায়ী, এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্ধ-বার্ষিক ক্ষতির রেকর্ড, যা আগের যেকোনো বছরের তুলনাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়, বরং কানাডার বর্তমান অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য সরাসরি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আলবার্টা প্রদেশ এ বছর সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়েছে। মাত্র এক মাসে একাধিক শিলাবৃষ্টির ঘটনায় ঘরবাড়ি ও গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাময়িকভাবে হোটেল, আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। গাড়ি বীমা কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, শুধু যানবাহনের ক্ষতিপূরণ বাবদই কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার দাবি জমা পড়েছে।

- Advertisement -

পশ্চিম কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এ বছর দাবানলের কবলে পড়েছে। দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রদেশজুড়ে ৫ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীকে বহু এলাকায় কার্যত হাল ছেড়ে দিতে হয়েছে, কারণ আগুনের গতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন শত শত পরিবারকে বাধ্য হয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে।

পূর্ব কানাডার কুইবেক ও অন্টারিওতে আকস্মিক ঝড় ও বন্যা সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ লাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে লাখ লাখ মানুষ কয়েক দিন অন্ধকারে কাটিয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ মেরামত ও জরুরি পুনর্গঠন ব্যয় হিসেব করলেই ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে বলে সরকারি হিসেবে জানা গেছে।

একজন বীমা ব্যুরোর বিশ্লেষক টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন,  ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারেরও কম ক্ষতি হতো। কিন্তু গত চার বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ থেকে তিনগুণে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৫.৯ বিলিয়ন ডলার। অথচ ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই তা লাফিয়ে উঠে গেছে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারে। বছরের বাকি ছয় মাসে এ অঙ্ক ১২ থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বীমা শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে থাকলে কোম্পানিগুলোর সামনে প্রিমিয়াম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। ইতিমধ্যেই গৃহ ও গাড়ি বীমার মাসিক প্রিমিয়াম ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, বিশেষ করে নদীঘেঁষা শহর বা অগ্নিপ্রবণ এলাকায় বীমা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের ভোগান্তিও সীমাহীন। বারবার ঘর মেরামত, পুনর্নির্মাণ এবং বিকল্প আশ্রয় ব্যয়ের বোঝা সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার ঋণের ফাঁদে পড়ছে। সরকারি সাহায্য পৌঁছাতে দেরি হওয়া এবং বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে মাসের পর মাস সময় লাগা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

অর্থনীতিবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে বলছেন এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব। গ্রীষ্মকালে দাবানল, শীতকালে তুষারঝড় এবং সারা বছর জুড়ে আকস্মিক বন্যা এখন কানাডার নতুন বাস্তবতা। সরকারি বাজেটে দুর্যোগ মোকাবিলা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও, তা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। স্থানীয় প্রশাসনও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে ক্রমেই বড় আর্থিক চাপে পড়ছে।

সবশেষে এক বিষয় স্পষ্ট এই যে চরম আবহাওয়া কানাডার ভবিষ্যৎ নয়, বরং বর্তমান। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দ্রুত দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া দেশের সামনে অন্য কোনো টেকসই পথ খোলা নেই। তা না হলে আগামী বছরগুলোতে কানাডার ক্ষতির হিসাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে যার ভার সামলাতে হিমশিম খেতে হবে অর্থনীতি, বীমা খাত এবং সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষকে।

- Advertisement -

Read More

Recent