বাণিজ্যিক ঝনঝনানি

বাণিজ্যিক ঝনঝনানি

যে যাই বলুক, আসলে সবাই পছন্দ করে বাণিজ্যিক ঝনঝনানি! “পুটাং পুটাং টাং” ধরনের নাচ-গান। আর সিনেমা? যা যা লুকিয়ে দেখা যায়, সেটুকুই।

বলার সময় বলবে, ভাইয়া আপনি আর সিনেমা বানালেন না কেন? কি যে মিস করি আপনার ছবি!

- Advertisement -

ঘোড়ার ডিম! বানালে দেখবেন?

আহা! সিনেমাটা বানিয়েছিলাম, প্রায় ১৬-১৭বছর একটু একটু করে টাকা জমিয়ে। ঐ টাকা দিয়ে কমপক্ষে তখন তিন-চারটা এপার্টমেন্ট বা একটা ভালো জমি কিনতে পারতাম। ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এখন বেশ লাফালাফি করতে পারতাম। বিদেশে বাড়িঘর কিনে হাম্বতাম্বি করতে পারতাম। করিনি! বরং বাড়িটা দেখে, ভেঙে ফেলবে শুনে ক্ষমতাবানদের যার পর নাই বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, হাজারীবাগের মতো ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় মানিকবাবুর বাড়িটা রেখে একটা কমিউনিটি কালচারাল হাব তৈরি করতে। পরামর্শ দিয়েছিলাম বিনিময়ে জমির মালিককে অন্য কোথাও জমিজমা বা টাকা দিতে। এলাকার লোকজনকে এর গুরুত্ব বোঝানো ইত্যাদি সকল চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ! বলা হলো আমি খুব ইমোশনাল, যেনো একটু বৈষয়িক হতে চেষ্টা করি। তাই সত্যি সত্যিই ইমোশনাল হয়েই মাথায় থাকা গল্পটা পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে একখানা স্ক্রিপ্ট দাঁড় করিয়ে আহা’র শুটিং করেছিলাম ঐ বাড়িটায়।

তারপর আরেক পর্যায়ে আবারো আরেক পরিস্থিতিতে পড়ে ইমপ্রেস এর কাছে বিনিয়োগের চেয়ে কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তারা যতটা সম্ভব প্রচারও করেছিল। কিন্ত আসল কথা হচ্ছে, কয়জন নিজে টিকিট কেটে দেখেছিলো আমার ছবিটা? কতোটা ফেরৎ পেয়েছিলাম সেই বিনিয়োগ থেকে, অন্তত খরচের টাকাটা উঠলেওতো স্বান্তনা থাকতো। আপনাদের আগ্রহ ঐ প্রিমিয়ার শো কিংবা ইউটিউব লিংক খোঁজা পর্যন্তই। যদি বলেন আহা ভালো ছবি হয়নি, একশত ভাগ মানলাম। তাহলে আর এটা নিয়ে কোনো কথা নেই। কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু? সেটাকি অচেনা? অজানা? সেটা নিয়েও কি আমার সামান্য যেটুকু মেধা, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস আছে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে উত্তেজনা ভরপুর ছবি বানানো কি খুব কঠিন বিষয়? যেকোনো অসসতাকে প্রাধান্য দিয়ে কৌশলে কিছু একটা ছবি বানালে দলে বলে গিলবেন। ভাঙা বাড়ি নিয়ে ছবি বানানোর দরকারটা কি আমার? আর্কিটেকচারের সাথে কি বাণিজ্যের সম্পর্ক নেই? যে সময়ে কাজ শুরু করেছি, টাকার বিছানায় আরামে শুয়ে থাকার কথা। ক্ষমতাধরদের জন্য কাজ করতে গিয়েওতো লালা ঝরেনি একফোঁটাও। লেখাপড়া পাশাপাশি কাজ করে যেটুকু টাকা জমিয়েছিলাম ছাত্রজীবন শেষে সেন্ট্রাল রোডের যোজন সমকালীন চিত্রশালা থেকে শুরু করে শেষের দিকে অমর একুশে বইমেলা পর্যন্ত চেষ্টা করে যেটুকু বুঝেছি, মোটামুটি মুখে এক কাজে এক।

আসল কথা হচ্ছে, সময়ের সত্য, অনুভূতির সত্য বলে যে বিষয়গুলো আছে সেগুলোতো বলার চেষ্টা করবে কেউ কেউ। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি বা সিনিয়র আরো কিছু মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধ, নীতি নৈতিকতা বা আরও কিছু নিয়ে কথা বলেন, তারাতো কখনোই চাইবেনা এসব নিয়ে খুব বেশি কাজ হোক। তারা কেন চাইবে এদেশে মেধাবী দর্শক শ্রোতা তৈরি হোক! চেতনা সম্মৃদ্ধ প্রজন্ম গড়ে উঠলে বিরাট বিপদ! তারা প্রশ্ন করা শুরু করবে। তবে শুধুমাত্র তাদের স্বার্থে কখনো প্রয়োজন হলে আগ্রহী হলেও হতে পারে। তাহলে আজকে এই সময়টায় দাঁড়িয়ে যারা একটু অর্থপূর্ণ কিছু করার চেষ্টা করবেন তারা উপায় কি? ওটিটির প্রেসক্রিপশন নিয়ে থ্রিলার বানানো, পুরোনো গানে নতুন বাজনা জুড়ে পেছনে তরুণীদের নৃত্য করানো, নাকি এর ওর কাছে চেয়ে সেই তহবিল দিয়ে কিছু একটা চেষ্টা করবে….? উপায় খুঁজে কত কিছু চেষ্টা করছে তরুণ স্বপ্নবাজরা। তাদের খেয়ে পরে বাঁচতে হয়, সংসারের চাপ সামাল দিতে হয়। বাণিজ্যিক দাপটের পাশাপাশি, মৌলিক -স্বাধীন চর্চাগুলো দেখার, জানার, শোনার আগ্রহ তৈরি করা আসলেই কি খুব কঠিন বিষয়? এদেশের সব শ্রোতা, দর্শক কি শুধুমাত্র জনপ্রিয় কন্টেন্টের জন্যই পাগল?

এখন আশা করাই একমাত্র ভরসা। এতদিনে যা হয়েছে, হুট করে হয়তো কিছু হবেনা। আগ্রহী শ্রোতা,দর্শকের অনুরোধ করতে পারি, বারবার -অসংখ্যবার। ভালো কাজ হুট করে হয়না, নিয়মিত চর্চা করলে মেধাবী মৌলিক কাজ আরো মানসম্পন্ন হবে। সমর্থন করলে, আগ্রহীরা কিছুটা একজোট হলে অনেক ধরনের বৈচিত্রপূর্ণ কাজের সম্ভাবনা বাড়বে। যেটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন স্বাধীন নির্মাতাগন, বিতরণ, প্রদর্শন ইত্যাদি নিয়েও নতুন উদ্যোগগুলো পরিনত হবে।

কেন এতকিছু লিখলাম? নিজের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের অসংখ্য মেধাবী নির্মাতা, কলাকুশলী তাদের স্বাধীন চিন্তা নিয়ে এগোনোর শক্তি পাক। আমার নয় বছরের বড় প্রক্রিয়া’য় ৬৩টা নতুন গান আর ৯টা পূর্ণদৈর্য্য ছবি নির্মাণের নানান অভিজ্ঞতার ক্লান্তি স্বত্বেও বারবার মনে হয় অন্তত কিছু মানুষ এক হবে।

- Advertisement -

Read More

Recent