সরল অংক

সরল অংক

রাবেয়ার গলার স্বর আর শরীর দুটাই কাঁপছে,বুকটাও এমন শব্দ করে ধকধক করছে … সামনে দাঁড়ানো শ্বশুর এবং শাশুড়ি দুজনই সেই ধকধক শব্দ শুনে ফেলবে মনে হচ্ছে।

শ্বশুর শাশুড়িকে এভাবে , এইধরনের একটা মিথ্যা বলতে হবে, কোনোদিন কল্পনাও করেনি রাবেয়া। আর এমন একটা বিষয়.. সেটা যে সত্যি সত্যি বলে,বুক ফুলিয়ে করবে তার তো কোন উপায় নেই।

- Advertisement -

একটু আগেই পানি খেয়েছিল রাবেয়া, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে জিভ,গলা এমনকি কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে।এমন হলে তো ধরা পড়ে যাবে সে… তার শ্বাশুড়ির যে পরিমাণ সজাগ দৃষ্টি,এই দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে রাবেয়া কি পারবে কাজটা করতে?কি বিপদের মধ্যে পড়লো রাবেয়া? ভাবতে ভাবতে শরীর টা আবার কেমন একটা শিরশির করে উঠলো।

রাবু , এই রাবু…তুই কখন ফিরবি?কিরে?

শাশুড়ির ডাকে চমকে উঠলো রাবেয়া…

কাঁপা স্বরে বলল,,জি খালা… মমমানে ,মা আমি ব‌ইটা নিবো কলেজ থেকে আর একটা নোট লাগবে,ওইটা আমার বান্ধবী আছে যে সায়মা,ওর কাছ থেকে নিবো,মা। সায়মারে কলেজে না পেলে ওর হোস্টেলে গিয়া নোটটা নিবো, এরপরই চলে আসবো মা।বেশি সময় লাগবে না,মা। মানে একটু সময় লাগবে,যদি সায়মা কে কলেজে না পাই… হোস্টেলে যেতে হবে তো….. রাবেয়া প্রানপন চেষ্টা করে যাচ্ছে, স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে।

পড়ালেখার বিষয়ে আমার কোনো না নাই, কোনদিন তোর পড়ার বিষয়ে বাঁধা দেই নাই যখন,আজ কেন দিবো বল? দরকার লাগলে তো যাইতে হইবোই,,,তবে তুই তো একা কোথাও যাস না,তাই আর কি…

জি মা… রাবেয়া মাথা নিচু করে সায় দিলো।

রাবেয়ার শ্বশুর খুব বিরক্ত,, উনি সবসময়ই রাবেয়ার উপর বিরক্ত হয়ে থাকেন। উনি বললেন,মরিয়ম তো এখনো কলেজে, ওরে ফোন করে বললে ,ও ই তো বই নোট আরো যা যা লাগে নিয়া আসতে পারে,,, তোমার হঠাৎ একা একা বের হ‌ইতে হ‌ইবো ক্যান, রাবেয়া?
এই ভয়টাই করেছিল রাবেয়া।

মরিয়ম রাবেয়ার ননদ, তারা একই কলেজে পড়ে, আলাদা আলাদা বিভাগে। মরিয়ম রাবেয়ার একবছরের জুনিয়র। মরিয়ম পড়ে ফার্স্ট ইয়ারে , কিছুদিন পর ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল দিবে আর রাবেয়া সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ওর সেকেন্ড ইয়ার ফাইনালের শেষ পরীক্ষা আর তার পরদিনই তার ফ্লাইট,মধ্যপ্রাচ্যে থাকা স্বামীর কাছে যাবে কয়েক মাসের জন্য বেড়াতে।যখন থেকে তার এই বিদেশে যাওয়ার কথা শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই তার শ্বশুর মারাত্মক অশান্তি করছে । এতো টাকা খরচ করে ব‌উকে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে কোন সাহসে?এই তর্জন গর্জন শুনতে শুনতে রাবেয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে জহির রাবেয়া কে বলেছে, তাঁর নাকি এক পয়সাও খরচ হয় নি… টিকেটের খরচ বাদ দিয়ে।সব নাকি জহিরের বুদ্ধির জাদু!

জহির রাবেয়ার স্বামী। একজন ভয়াবহ কৃপণ লোক।

রাবেয়া কে নিজের কাছে কিছুদিনের জন্য নিতে চায় বলে খুব একটা অসুস্থতার নাটকও সাজিয়েছে জহির।যেন জহিরের মায়ের মন নরম হয়। নিজের পরিবারের সাথে এরকম নাটক করতে একটুও দ্বিধা করেনা জহির। বরং খুব হাসি হাসি মুখে জহির বলে যে সে-ই নাকি তার ত্যাদড় বাবার একমাত্র ঔষধ।

যাই হোক,এইসব অশান্তির মধ্যে ই পরীক্ষা দিচ্ছে রাবেয়া।পরীক্ষা আছে বলেই নোট নেয়ার কথা বলে বেরোতে চেষ্টা করছে সে।

কিরে রাবু, মরিয়ম ফোন ধরে কিনা দেখ আরেক বার চেষ্টা ক‌ইরা ।

শাশুড়ির কথা মতো ফোন বের করে, মরিয়মকে ফোনে ধরার চেষ্টা করছে ,আর মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে রাবেয়া। আজকে যদি বের হতে না পারে তাহলে আর একা বের হবার সুযোগ নেই। ও বের হলে বেশিরভাগ সময়ই, ননদ মরিয়ম ওর সাথে থাকে।যে কাজে সে বের হচ্ছে, তা মরিয়ম কে জানানো যাবে না। মরিয়ম কেন… দুনিয়া র কাউকে ই জানাতে পারবেনা। কোনো বান্ধবী কে দিয়েও কাজটা করানো যাবে না, অবিবাহিত কাউকে দিয়ে তো এই কাজ করানোও যাবেনা…. তাছাড়া তার অল্প যে কয়জন বিবাহিত বান্ধবী আছে তারা সবাই মরিয়মের সাথে অনেক ক্লোজ।তারা কখনোই এই কথা গোপন রাখতে পারবে না।

কি বিপদের মধ্যে ফেললো তাকে জহির?,…সে রাবেয়া কে বলেছে দেশের সরকারি স্বাস্হ্যকেন্দ্র থেকে নামমাত্র মূল্যে যে কনডম পাওয়া যায় সেটা যাবার সময় নিয়ে যেতে। বিদেশে বা দেশে দোকান, ফার্মেসী থেকে দাম দিয়ে কনডম কিনতে রাজি না জহির। সরকারি হাসপাতালে নাকি মাত্র দশ পয়সা বা বিশ পয়সা করে একশত কনডমের বক্স মাত্র বিশ টাকায় পাওয়া যায় যেটা বাইরে থেকে কিনতে দশগুণ,বিশগুন বেশি টাকা লাগবে। নিজের স্বামীর কৃপনতায় অবাক হয়ে গেছে রাবেয়া। মনে হচ্ছে যাওয়াটাই কোন ভাবে যদি আটকে দেয়া যেত!

ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল,যাক্… মরিয়ম ফোন টা না ধরে বাঁচিয়ে দিল রাবেয়াকে। মনে হচ্ছে শ্বশুর শাশুড়ি আর আপত্তি করবে না।একটা বিপদ কাটলো, রাবেয়ার চিন্তা কমছে না.. বের না হয় হলো,,, কিন্তু যে কাজে বের হচ্ছে সেটা কি সে শেষ করতে পারবে?কেউ যদি দেখে ফেলে রাবেয়াকে তাহলে কি করবে রাবেয়া? সরকারি হাসপাতালে আশেপাশের কত পরিচিত মানুষ থাকতে পারে, কেউ কোন ভাবে দেখলেই তো বিপদ। তার শ্বশুর বাড়িতে সাথে সাথে খবর চলে আসবে। তখন কি জবাব দেবে রাবেয়া? বিদেশে স্বামীর কাছে যাচ্ছে বলে সরকারি হাসপাতাল থেকে কনডম কিনতে গিয়েছিল ..এই কথা কি বলতে পারবে সে?

জহিরের এমন ঘাড়ত্যাড়া স্বভাব যে এখন যদি রাবেয়া নিজের টাকা খরচ করে বাইরে থেকে কিনে নিয়ে যায় তাহলেও জহির খুব ক্ষেপে যাবে।দেখা যাবে এই নিয়ে ঝগড়া করে ই ছুটি শেষ হয়ে যাবে। ঝগড়াঝাটি অশান্তি একেবারে ভালো লাগে না রাবেয়ার।কম অশান্তি তো দেখেনি এই এতটুকু বয়সে।

রাবেয়ার স্বামী জহির সম্পর্কে তার খালাতো ভাইও।

রাবেয়ার শাশুড়ি তার আপন বড় খালা, একমাত্র খালা।ছোট বেলা থেকেই এই খালা তাকে অনেক আদর করেন। রাবেয়ার মা অল্প বয়সে মারা গেছে, রাবেয়ার তখন মাত্র দশ বছর…, শৈশব শেষ হয়নি ,আবার কৈশোরও শুরু হয় নি, ,। রাবেয়া তার বিয়ের আগের সময়ের বেশিরভাগই বড় খালার বাড়িতে কাটিয়েছে। এছাড়া আর উপায় কি…বাবাতো বাড়িতেই থাকতেন না। দাদা দাদীও বেঁচে নেই।ফুপু, চাচা আছেন কিন্তু রাবেয়ার মা মারা যাওয়ার পর,তারা কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেনি।নানী আছেন এখনো, তিনিও নিজের মেয়ের স্মৃতি চিহ্ন রাবেয়াকে খুব আগলে রাখতেন। নানীর এখন অনেক বয়স হয়েছে,নিজেই কষ্ট করে চলাফেরা করে।নানী অবশ্য মা এর প্রাপ্য সম্পত্তি বিক্রি করে অনেক আগেই কিছু টাকা রাবেয়ার জন্য জমা রেখেছিলেন ব্যাংকে,সেই টাকা দিয়েই বিদেশে গিয়েছে জহির।

এছাড়া বড়খালা রাবেয়ার দেখাশোনা করে বলে নানী শুনেছি বড়খালা কেও নিয়মিত টাকা পয়সা দিতো,যেন রাবেয়ার কোন অযত্ন অবহেলা না হয়।এই পরিবারের দূর্বলতা সবাই জানে,ওরা ভীষণ কৃপন, এছাড়া এ পরিবারের আর কোন দোষ নেই, রাবেয়ার চোখে।

মা মারা যাওয়ার পর সবাই অনেক চেষ্টা করেছিল বাবার আবার বিয়ে দিতে, কিন্তু বাবা কোনভাবেই রাজি হননি। নিজের মনকে আর সংসারে বসাতে পারেনি বাবা। বাড়িতেও থাকেন না ঠিক মতো, কোথায় কোথায় যে বাবা ঘুরে বেড়ায়, কি যে করে, কেউ ঠিকমত জানেনা। তার বাবা একজায়গায় বেশিদিন থাকতে পারে না, ঘুরে ঘুরে কোথায় কোথায় থাকে,মানুষের সেবা করে। অসুস্থ মানুষ দেখলেই নাকি বাবা তার সেবা যত্ন শুরু করে।মা এর সেরকম বড় কোন অসুখ ছিল না,… গর্ভবতী অবস্থায় ডায়রিয়া হয়ে মা মারা যান,বাবা তখন অফিসের কি একটা কাজে মা’কে অসুস্থ রেখেই ঢাকা গিয়েছিল। মা নাকি বাবা কে বারন করেছিল যেতে।রাবেয়ার জন্মের দশ বছর পর তার মা দ্বিতীয় বার সন্তান সম্ভাবা হয়,কোন জটিলতা ছিল কিনা কে জানে?

তবে বাবার ধারনা মা এর মৃত্যু হয়েছে অবহেলায়। নিজের অসুস্থ স্ত্রী কে সে ঠিক মতো যত্ন করেনি,তাই ওই সময়ে ডায়রিয়ার মতো সাধারণ অসুখে মা দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে।

মা এর বারন উপেক্ষা করে বাবা ওই অবস্থায় ঢাকা গিয়েছিল বলে মা খুব অভিমান করেছিল। শরীর যখন খুব খারাপ তখনও বাবাকে ফোন করেনি ।মা এর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বাবা সেই যে বাড়ি এলো আর চাকরিতে ফিরে যায়নি।

বড় খালু ,মানে রাবেয়ার শ্বশুর বাবাকে দুই চোখে দেখতে পারেন না। উনি বলেন, বাবার নাকি সব ভন্ডামি…, নিজের মেয়ের দিকে যে খেয়াল করে না সে আবার কিসের জনসেবা করে? কিন্তু রাবেয়া জানে, বাবা তাকে কতো ভালোবাসে। বাবা অনেক চেষ্টা করেও সংসারে ফিরতে পারে না। মা কে ছাড়া বাবা একেবারে অসহায় হয়ে গেছে, বাবার মাথা ঠিক মতো কাজ করে না, কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে বাবা। বেঁচে থাকতে যে মানুষটাকে ঠিকমত সময় দিতে পারে নি, মৃত্যুর পর তার জন্য বাবার সবটুকু সময়…. বাবার জগৎ জুড়ে কেবল একজন চলে যাওয়া মানবী।কি অদ্ভুত এই সম্পর্কগুলো!

জহিরের সাথে রাবেয়ার বিয়ে হোক এটা বাবা কখনো চায়নি,তাই রাবেয়ার বিয়ের দুই বছরের সময়ে একবার‌ও আসেনি বাবা। মাঝে মাঝে যখন খুব মনে পড়ে রাবেয়াকে তখন একটা ফোন দেয় ।খুব বেশি কথাও বলে না ,,শুধু কেমন আছিস ..ভালো আছিস তো ..বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, ফোন রেখে দেয়।

সন্তান সম্ভবা অবস্থায় রাবেয়ার মায়ের মৃত্যু হয়েছে বলে, বাবার মনে সবসময় একটা ভয় কাজ করে। সরাসরি রাবেয়াকে কিছু না বললেও অনেক বারই খালাকে ফোন করেছে বাবা। অল্প বয়সে সন্তান নিলে কতরকম জটিলতা হতে পারে সেগুলো নাকি বুঝিয়েছে বাবা। অবশ্য খালা নিজেও রাবেয়া র বিষয়ে অনেক যত্নশীল।

খালাতো ভাইকে বিয়ে করার কথা রাবেয়া কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি, তাদের দুজনের চরিত্রের ধরনে আকাশ পাতাল পার্থক্য ।রাবেয়া বুঝতেও পারেনি কখন জহির মনে মনে রাবেয়াকে বিয়ে করার জন্য ভেবেছে ।জহিরের মাথা ভর্তি দুষ্ট বুদ্ধি। জহিরের জন্য যখনই বাসা থেকে বিয়ের পাত্রী দেখা শুরু হয় তখন জহির তার বন্ধুকে দিয়ে বাসায় একটা ভুয়া খবর পাঠায় ,।খবরটা হল ..জহির একটা হিন্দু মেয়েকে ভালোবাসে ।

এই খবর বাসায় জানাজানি হবার পর ,বড় খালা মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়ে। ওই হিন্দু মেয়ের হাত থেকে জহিরকে উদ্ধার করার জন্য , কিভাবে রাতারাতি রাবেয়ার সাথে জহিরের বিয়ে হয়…সে এক বিশাল ইতিহাস।

বিয়ের রাতে। জহির যখন বিজয়ের হাসি মুখে ঝুলিয়ে নিজের সাজানো প্রেমের গল্পের কথা রাবেয়া কে বলেছে ,..তখন ভীষণ অবাক হলেও মনে মনে একটু আনন্দও হয়েছিল তার ।এই আনন্দের কথা অস্বীকার করবে না রাবেয়া। প্রথমবারের মতো কোনো পুরুষের মুখে ভালোবাসার কথা শুনে যে অনুভূতি হয়েছিল তাকে ভালোবাসা বলে কিনা জানা নেই রাবেয়ার। খুব অদ্ভুত সুন্দর এক অনুভূতি সেটা।

স্বামী হিসেবে জহিরকে কখনোই খুব ভালো বলেনা রাবেয়া। জহির মারাত্মক একরোখা স্বভাবের। সাথে ভয়ানক কৃপণতা তো আছেই। তবে মাঝে মাঝেই রাবেয়ার মনে হয়, জহির তাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসে।এই ভালোবাসার জন্যই জহিরের অন্য অনেক দোষ ত্রুটি নিয়ে খুব একটা মন খারাপ করে না সে।যতটা সম্ভব হয় তার পক্ষে ততটা সে ঝামেলা এড়িয়ে চলে। খুব বেশি আশা করেনা কখনোই..

খুব বেশি অভিমান অভিযোগ‌ও নেই তাই। রাবেয়া জানে তার খুঁটির জোর কতখানি।

সরকারি হাসপাতালের সামনে এসে রাবেয়া ঘোমটা টা বড় করে টেনে দিল। এখানে সে দু একবার এসেছে খালার সাথে।তবে কনডম কোথা থেকে নিতে হবে জানা নেই তার। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ালো রাবেয়া। মাথা একেবারেই কাজ করছে না।এতো ভয় লাগছে তার যেন কোথাও চুরি করতে এসেছে সে,ধরা পড়লো বলেই। সামনে দিয়ে একজন মহিলা খুব আস্তে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। ভালো করে তাকাতেই রাবেয়ার মনে হলো, মহিলাটি প্রেগন্যান্ট। মাথাটা কেমন একটু ঝিমঝিম করে উঠলো রাবেয়ার। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ওই মহিলাকে অনুসরণ করলো সে। সরকারি হাসপাতাল এটা, এতো এতো মানুষ হেঁটে যাচ্ছে পাশ দিয়ে কিন্তু রাবেয়ার মনে হচ্ছে সবাই তাঁকেই যেন দেখছে।

না রাবেয়া ভুল করেনি মহিলার পিছন পিছন এসে। মহিলা টা মা ও শিশু সেবা কেন্দ্রে এসেছে। পাশেই পরিবার পরিকল্পনা সেবা। অনেক সুন্দর সুন্দর কথা লেখা চারপাশের দেয়ালে। খুব মিষ্টি কতগুলো শিশুর ছবি। হঠাৎ রাবেয়ার চোখে পানি চলে এলো।তার কোলে কি আসবে এরকম কেউ?নাকি মায়ের মতো রাবেয়াও মরে যাবে?

রাবেয়া কে অস্হির চোখে এদিক ওদিক তাকাতে দেখে একজন তার দিকে এগিয়ে এলো।

আপনার কি দরকার আপু?

রাবেয়া ভালো করে তাকিয়ে দেখলো ভীষণ হাস্যোজ্জ্বল মুখের একটা মেয়ে। ডাক্তার কিনা বুঝতে পারলো না রাবেয়া।

মেয়েটি এবার রাবেয়ার হাতটা ধরে সামনের চেয়ারে বসার ইশারা করলো। তারপর বললো আপনি কি পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিতে এসেছেন,আপু? রাবেয়া খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো এবার। মনে মনে ভাবলো আর চিন্তা নেই, ঠিক জায়গায় ই এসেছে সে। অনেক কষ্ট করে একটু হেসে রাবেয়া বললো যে তার কনডম লাগবে।

মেয়েটি আরেকজন মধ্যবয়সী মহিলাকে ডাকলো, তারপর রাবেয়ার কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য জেনে নিয়ে একটা ফরম পূরণ করে একশটা কনডমের একটা বক্স দিল তার হাতে। পরিবার পরিকল্পনার আরো কিছু পদ্ধতি সম্পর্কে রাবেয়াকে জানালো এবং এখানে সেবা নিতে আসার জন্য রাবেয়াকে খুব সুন্দর করে ধন্যবাদ জানালো। রাবেয়ার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই তার কাজটা কিভাবে শেষ হয়ে গেল.. রাবেয়ার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। কনডমের প্যাকেটটা তাড়াতাড়ি ব্যাগে ভরে নিয়ে ঘোমটা টা ভালো করে টেনে দ্রুত পায়ে হাসপাতাল থেকে বের হলো রাবেয়া।একটা রিকশা ডেকে সোজা বাজারের দিকে গেল সে। আগেই ঠিক করে রেখেছিল রাবেয়া যে কিভাবে এই প্যাকেট টা গোপন করবে। বাজারের সামনে বসা হকারদের থেকে বড় একটা প্লাস্টিকের বক্স কিনলো তারপর তড়িঘড়ি করে কনডমের বক্স টা প্লাস্টিকের বক্সে ঢোকালো।এতো বড় কনডমের বক্সে রাবেয়ার কলেজ ব্যাগটা খুব ফোলা দেখাচ্ছিল।ব্যাগের ভিতর একটা পুরনো খবরের কাগজ আর স্কচটেপ ও এনেছিল সাথে করে রাবেয়া। সেগুলো ব্যবহার করে প্লাস্টিকের বক্সটা র‌্য‌পিং করলো এবার। এগুলো করতে করতে বারবার ঘড়ি দেখছিল রাবেয়া।যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি করছিল সে।

বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নেমে রাবেয়ার হাত পা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গেল। খুব বেশি দেরি হয় নি যদিও তবু বারবার মনে হচ্ছে সে ধরা পড়ে যাবে শাশুড়ির কাছে। আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে রাবেয়া নিশ্চিন্ত হলো অনেকটা। রাবেয়ার শ্বশুর ঘুমাচ্ছেন, প্রতিদিন ভাত খাওয়ার আগে তিনি একটু ঘুমিয়ে উঠেন।অবসর মানুষ তিনি, সময় কাটে না।ভাত খাওয়ার পর অবশ্য তিনি আর ঘুমান না… বাড়ির পিছনে ছোট একটা সবজি বাগান আছে, সেখানে এটা ওটা করে ওইসময় টা পার করে দেন।

রাবেয়ার শাশুড়ি এখনো গোসলে আর মরিয়ম এখনো ফেরেনি কলেজ থেকে। মনে হচ্ছে জোর বাঁচা বেঁচে গেল সে। তাড়াহুড়ো করে বক্সটা আলমারি তে রাখতে হবে। আলমারির চাবি টা নিয়ে রাবেয়া দ্রুত হাতে বক্সটা যতটা সম্ভব ভিতরে রাখতে চেষ্টা করছিল। আলমারির ভিতরে পুরনো কাপড়ে ঠাসা,এই বাড়িতে কেউ কিছু ফেলতে দেয়না। বক্সটা ভিতরে রাখতে গিয়ে বেশ কিছু কাপড় নিচে পড়ে গেল। রাবেয়ার শাশুড়ি গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আলমারি খোলার শব্দ শুনতে পেয়ে সোজা রাবেয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো।

কি রে রাবু? তুই বাইর থেকে আইসা হাত মুখটাও তো ধুইলি না… বোরখা টা ও খুলোস নাই… আলমারি তে কি রাখতে হ‌ইবো? নাকি কিসু খুঁজতেসস?

রাবেয়া এবার যেন লজ্জা আর ভয়ে,চোখে অন্ধকার দেখছিল। নিজেকে অনেক কষ্ট করে স্বাভাবিক রেখে বললো, ওই একটা বক্স খালা… তোমার ছেলের পরিচিত একজন দিলো। আমি যাচ্ছি শুনসে কার কাছ থেকে…বললো আমার সাথে নিয়ে যেতে। তোমার ছেলের সাথে নাকি কথা হ‌ইসে।

রাবেয়ার শাশুড়ি একেবারে আৎকে উঠলো এবার।কি বলস রাবু? কিসের বক্স?কে দিলো তোরে?নাম বলে নাই? বাসায় আইসা দিয়া গেল না ক্যান?ক‌ই রাখসোস? আমারে না দেখাইয়া আলমারি তে রাখতে কে বলল তোরে? এখনো তো বিদেশে যাস নাই.. এরমধ্যেই লুকাচুরি শুরু?
এই ভয়ে ই ছিল রাবেয়া।ইশ,বক্স টা তার শাশুড়ি দেখে নাই।কেন যে বলতে গেলো বক্সের কথা!

না আর ঘাবড়ে গেলে চলবে না…

আরে খালা তুমি এতো রাগ করতেসো ক্যান? তোমার ছেলেই আমারে বলসে এটা নিতে। তোমার ছেলের এক বন্ধু আছে ওখানে, তার জন্য তার আম্মা কি একটা খাবার জানি দিসে ।ওই দেশে নাকি পাওয়া যায় না।

রাবেয়ার শাশুড়ি খুব সন্দিহান চোখে তাকিয়ে ছিল এতোক্ষণ,
একটু স্বাভাবিক চোখে এবার বললো ” কি খাবার?ক‌ই আমারে দেখতে দিলে কি হয়?আর খাবারের জিনিস কেউ আলমারি তে রাখে? তোর কি বুদ্ধিসুদ্ধি হবে না আর?দে আমার কাছে… ফ্রীজে রাইখা দেই।

রাবেয়া বক্স টা কাঁপা হাতে শাশুড়ি কে দিলো।
তার শাশুড়ি বক্স টা কয়েকবার জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিল।কি আছে সেটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিলেন তিনি। তারপর গন্ধ শুঁকে দেখলেন। খুব বিরক্ত হয়ে তিনি বিড়বিড় করছিলেন..কি আছে কিচ্ছু বুঝতে পারতাসি না।

বক্স টা নিয়ে সোজা ডিপ ফ্রিজে রেখে দিলেন।
রাবেয়া র খুব অসহায় লাগছিল।ডিপ ফ্রিজে কনডম ভাল থাকবে কি থাকবে না ভাবতে ও ইচ্ছা করছিল না তার। সারাদিনে সেরকম কিছুই করেনি তবু কেন যে হঠাৎ এতো ক্লান্ত লাগছে রাবেয়ার। কোন রকমে বাইরের জামাটা পাল্টে শুয়ে পড়লো সে।

চোখের পানি ও আটকাতে পারছে না,…
কেউ দেখলে কি যে হবে? জহিরের উপর খুব রাগ হলো তার.. নিজের ব‌উকে কেউ এমন বিপদে ফেলে? কনডমের বরফ হ‌ওয়া বক্সটাই কি নিতে হবে তাকে? নাহলে হয়তো জহির বিশ্বাস ই করতে চাইবে না রাবেয়া কে…
সারাদিনের সবকিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল রাবেয়া।

শেষাংশ…
আগামীকাল রাবেয়ার ফ্লাইট।

একা একা এতো দূর যাবে, তার উপর প্রথম বার বিদেশে যাচ্ছে। বিদেশ তো অনেক দূরের কথা দেশের মধ্যেও কখনো রাবেয়া একা কোথাও গিয়ে থাকে নি।খালা সবসময় তার সাথে সাথে থেকেছে। মরিয়ম‌ও সাথে সাথে থেকেছে অনেক, সবাই কে ছেড়ে বেড়াতে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে রাবেয়ার। নিজের স্বামীর কাছে বেড়াতে যাবে বলে কোন আনন্দ হচ্ছে না মনে। তাছাড়া জহির রাবেয়ার উপর খুব রেগে আছে। সেদিনের সব ঘটনা শোনার পর থেকেই রাগারাগী করে যাচ্ছে জহির। রাবেয়া কেন তার শাশুড়ি কে বলতে পারলো না বক্সের ভিতর কি আছে ,সেটার জন্য জহিরের এতো রাগ। জহিরের ভাষ্যমতে এটা একটা দরকারি জিনিস। এতে নাকি লজ্জা বা ভয় পাবার কিছু নেই। রাবেয়া র দিক টা জহির বুঝতেই চাইছে না।

কিছুই ভালো লাগছে না রাবেয়ার । নিজের ব্যাগটা অল্প কিছু জিনিস দিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে সে।একা যাবে বলে সবাই বলছে একটু কম জিনিসপত্র নিতে।যেন বাড়তি কোনো টেনশন না থাকে। শেষবারের মতো নিজের ব্যাগের জিনিসগুলো দেখছিল রাবেয়া,সব ঠিকঠাক আছে কিনা।
হঠাৎ শাশুড়িকে দেখে উঠে দাঁড়ালো রাবেয়া।

কিরে রাবু, সব ঠিকঠাক মতো নেয়া হ‌ইসে কিনা দেখসস?

জি মা, দেখসি। অল্প কয়টা জিনিস তো। আছে সব ঠিক মতোই।

রাবু মা, একটা জিনিস.. এইটা একটু তোর ব্যাগে ঠিক ক‌ইরা রাখ।

রাবেয়া দেখলো তার শাশুড়ির হাতে একটা ছোট্ট বক্স, কাগজ দিয়ে মোড়ানো। রাবেয়া বুঝতে পারছে না,কি দিতে চাইছে , এভাবে লুকিয়ে.. কেমন ফিসফিস করেও কথা বলছে তার শাশুড়ি…

মা রে… আমার ছেলেরে তো আমি চিনি।শুনসি বিদেশে এগুলো অনেক দাম। টাকা খরচের ভয়ে যদি না কিনে তাইলে তো তোর জন্য সমস্যা,মা।এই বয়সে তোর এদিক ওদিক কিছু হোক তোর বাবা সেটা চায় না। তুই পড়াশোনা শেষ কর। তারপর না হয়… মানে..এইটা সরকারি হাসপাতাল থেইকা আজকে আনলাম তোর জন্য।এটা সাথে রাখ।

রাবেয়ার বুঝতে বাকি রইল না যে তার শাশুড়ি সরকারি হাসপাতাল থেকে এক‌ইরকম একশো টা কনডম এনেছে তার জন্য।

বক্সটা হাতে নিয়ে ..শাশুড়ি কে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো রাবেয়া। উনি কি কিছু বুঝতে পেরেছেন?জানে না রাবেয়া, জানতে চায় ও না।

তারচেয়ে শাশুড়ি কে ধরে কাঁদতে বেশ শান্তি লাগছে।

এই কান্না কষ্টের,এই কান্না বিশ্বাসের,এই কান্না ভরসা আর ভালোবাসার।

রাবেয়ার মনে হলো জীবনটা আসলে ততটা জটিল নয়,যতটা সে ভেবেছিল।

- Advertisement -

Read More

Recent