ভয়ংকর স্মৃতি

ছবি চৈতি আহমেদ

জীবনের একটা ঘটনা এখনো মনে করলে গা শিওড়ে ওঠে।

২০০৩ সালের ঘটনা। আমার মেয়ের বয়স তখন দের বছর। তিন চার দিন থেকে মেয়ে আমার খুব অসুস্থ বাড়িতে শশুর শাশুড়ি আমি আর আমার মেয়ে।

- Advertisement -

মেয়ের বাবা চাকরির সুবাদে ফকিরহাট থাকে।

মেয়ের এই অসুস্থতার কথা শুনে আসতে চেয়েছিলো কিন্তু হালকা জ্বর, তাই আমি নিষেধ করলাম। বললাম তুমি চিন্তা করো না, আমার মা তো আছে।

তাছাড়া তোমার বাবা মাও আছে। যদিও আমার শশুড় শাশুড়ি অনেক বয়স্ক। তবুও কাছে থাকলেই শক্তি লাগে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানানোর জন্য রান্না ঘরে গেলাম। নাস্তা বানানো শেষ করে টেবিলে রেখে রুমে এসে দেখি আমার মেয়েটা এখনো ঘুমোচ্ছে। ৯ টা বাজে বাচ্চাটা এখনো ওঠেনি কেন? মেয়েটা আমার অনেক সকালে উঠে যায় কিন্তু আজকে উঠতেছে না। শরীরটা খারাপ একারনে উঠতে হয়তো দেরি করছে। আসলে শরীর খারাপ থাকলেও বাচ্চাটা আমার অনেক সকালে উঠে বিছানায় শুয়ে শুয়েই খেলাধুলা করে।

মনের ভিতরে কেমন একটা ভয় লেগে উঠলো। মেয়েটাকে উঠানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু বাচ্চাটা আমার চোখ খুলতেছে না। এত নাড়াচাড়া করতেছি তবুও চোখ খুলছে না।

আমার খুব টেনশন হতে শুরু করল কি করবো বুঝতে পারছি না। শশুর শাশুড়ি দুইজন অনেক বয়স্ক। তাদের পক্ষে সম্ভব না তাদের নাতনিকে নিয়ে আমার সাথে হসপিটালে যাওয়া।

আমাকেই যেতে হবে। ওর বাবাকে খবর দিলে এই মুহূর্তেই আসতে পারবে না। চাকরির জায়গাটা অনেক দূরে। আমি আমার মাকে খবর দিলাম।

সবকিছু ঠিকঠাক করে বাসা থেকে বের হতে হতে এগারোটা বেজে গেলো।

রিকশা করে মেয়েকে নিয়ে শিশু হসপিটাল এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রাস্তায় যেতে যেতে মেয়েটাকে অনেকবার তোলার চেষ্টা করলাম কিছুতেই চোখ খুলছে না।

আমি ভয়ে চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছি। শরীর ঘামছে। এদিকে মনে হচ্ছে রাস্তা যেন শেষ হচ্ছে না। আমার মা বলছে তুই এত চিন্তা করিস না ইনশাল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত হসপিটালে এসে পৌছালাম।

দ্রুত ডিউটি ডাক্তারকে ডাকলাম।

ডাক্তার এসে আমার মেয়েকে ভালোভাবে দেখতেছে। এরপরে উনি আমার মেয়ের নাভিতে বেশ জোরে একটা চিমটি কাটলো তাতেই দেখলাম বাচ্চা আমার উফ্ফ করে উঠলো।

আমি একটু স্বস্তি বোধ করলাম। মনের মধ্যে অজানা অনেক ভয় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেগুলো সরে গেল।

এরপরে নিয়ম মতো সবকিছু ঠিকঠাক করে আমারা একটা কেবিনের ব্যবস্থা করলাম। হাতে স্যালাইন চলছে।

বেশ কিছু সময় পরে মেয়ে আমার চোখ খুলল। আমার মা আর আমি বাচ্চাটার মাথার পাশে বসে আছি। একটু পর পর নার্স এসে আমার মেয়েকে দেখে যাচ্ছে। যা যা ওষুধ লাগবে সব নিয়ে আসলাম।

দুপুর ২ টার দিকে নার্স এসে আমাকে বলল রোগীকে স্যুপ খাওয়াতে হবে। স্যুপ নিয়ে আসেন।

আমি আম্মাকে বসিয়ে স্যুপ আনতে রেস্টুরেন্টে গেলাম।

শিশু হসপিটাল থেকে অল্প খানিকটা দুরে একটা রেস্টুরেন্ট।

পায়ে হাঁটা পথ।

আমি একরকমের আনমনে হাঁটতে হাঁটতে রেস্টুরেন্টে পৌছালাম।

ভিতরে ঢুকে দাঁড়ালাম এর মধ্যে ৩-৪ জন লোক আমার পাশে এসে জিজ্ঞেস করল আপা কি লাগবে?

আমি বললাম স্যুপ আছে?

লোকগুলো বলল হ্যা হ্যা আছে। আপনি বসেন ১০ মিনিটের মধ্যে তৈরি করে দিচ্ছি। পাশে থাকা সোফায় বসলাম।

রেস্টুরেন্টের ভিতরে অন্ধকার অন্ধকার একটা পরিবেশ। দুপুর ২ টা বাজে কিন্তু মনে হচ্ছে রাত।

একধরনের হালকা লাইটের আলো জ্বলছে।

অন্যমনস্ক ভাব আমার।

মেয়েটার কাছে মন পড়ে আছে। শুধু চোখে ভাসতেছে সেই নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। এরমধ্যে ৬-৭ জন লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো আমাকে দেখছে।
আবার ভিতরে যাচ্ছে।

আমি অত কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।

খানিক বাদে আর একজন লোক রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। জিজ্ঞেস করল স্যুপ আছে?

আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো বলল না ভাই স্যুপ নাই।

স্যুপ বানানো আজ শেষ হয়ে গেছে। লোকটা শুনে চলে গেল।

লোকটা বের হওয়ার সাথে সাথে ভেতরে থাকা একজন লোক অন্য লোকগুলোর সাথে কি যেন বলাবলি করে দ্রুত গতিতে যেয়ে গেট লক্ করে দিলো।

আমি তখনো কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। চুপচাপ বসে আছি। মাথায় কিছু কাজ করতেছে না। দুই থেকে তিন মিনিট পর হঠাৎ কেমন যেন মনের মধ্যে করে উঠলো। কানে কথাটা বাঁজতেছে, না ভাই স্যুপ নাই।

আমি যেন কিছু একটা বুঝতে পারলাম। অশনি সংকেত, কোন একটা ভয়, কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে আমার সাথে।

আমি কি মনে করে ওদেরকে বললাম ভাই স্যুপ বানাতে আর কত সময় লাগবে? আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকা লোকগুলো বলল এইতো আপনি বসেন আমরা এখনই নিয়ে আসছি।

এরপর আমি কি মনে করে বললাম ভাই বাহিরে আমার রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আসি।

কারন স্যুপ দিতে তো কিছুটা সময় লাগবে। রিকশাওয়ালা ভাই তো তাহলে অনেক্ক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকবে!

এটা আসলে আমি বানিয়ে বলেছি। কোন রিকশা দাঁড়িয়ে নেই।

আমি বুঝতে পারলাম আমার সাথে খারাপ কিছু হতে চলেছে তাই হঠাৎ করে মাথায় কথাটা এলো তাই বললাম।

ওরা বলল হ্যাঁ হ্যাঁ আপা তাই করেন। রিক্সাটাকে ছেড়ে দিয়ে আসেন। প্রায় ১০ জন লোক আমার পাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা গেটের লক্ খুলে দিতে যতটুকু সময়। আমি বাহিরে যেয়ে আর পিছন দিক না ফিরে দৌঁড়ে এক দোকানে ঢুকলাম।

দোকানের লোকটাকে বললাম ভাই আমাকে একটু আশ্রয় দেন। দোকানদার ভাই বলল আপা আপনার কি কোন সমস্যা হয়েছে? আমি বললাম ভাই আমি বিপদে পড়েছি আমি কিছুটা সময় আপনার দোকানে একটু বসতে চাই।

২-৩ মিনিট পর আমি তাকিয়ে দেখছি রেস্টুরেন্টের ভিতর থেকে প্রায় সেই ৮-১০ জন লোক আমাকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছে। ওরা আমাকে পাগলের মত এদিক ওদিক খুঁজছে।

কিছুক্ষণ পর দেখলাম ওরা ভিতরে চলে গেল। এরপরে আমি খুব দ্রুত গতিতে হসপিটালে চলে আসলাম। এসে আমার মাকে সব খুলে বললাম।

বিকালের দিকেই আমার মেয়ের বাবা খুলনায় এসে পৌছালো। পরে তাকে সব খুলে বললাম। কিন্তু আমাদের সেই পরিস্থিতি ছিল না সেখানে যেয়ে কিছু করার কারন আমার মেয়ে খুব অসুস্থ।

বাচ্চাটাকে নিয়ে আমরা সব ব্যস্ত।

মেয়েটা আমার দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেছে। আজ ওর বিয়ে। মেয়েটা আমাকে ছেড়ে শশুর বাড়ি চলে যাবে।

ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছি সেদিন যদি ওখান থেকে বের হয়ে না আসতে পারতাম, তাহলে হয়তো ওই লোকগুলো আমাকে হিংস্র হায়েনার মতো ছিড়েখুঁড়ে খেতো, এরপর প্রমান মুছে ফেলার জন্য আমাকে নির্ঘাত মেরে ফেলতো। আমার লাশ গুম করার জন্য কোন নদীতে ভাসিয়ে দিতো।
পাশেই তো রয়েছে আমাদের ভৈরব নদী।

সত্যি সেদিন সয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আমাকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে।

- Advertisement -

Read More

Recent