
কীইইই?
পুরো বিশ সেকেন্ড ধরে মহিলাটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমি আনিসের স্ত্রী। মাহিলাটার এই কথাটা বার বার মাথার ভেতর চক্কর দিতে থাকলো।
“অসম্ভব!” আমি এমনভাবে কথা বলা শুরু করলাম যেন সামনে দাঁড়ানো মহিলাটা একটা শিশু, আর তাকে বিবাহের ধারণা ব্যাখ্যা করতে হবে। “আমি আনিসুর রহমানের স্ত্রী। আর একজনের একটিই স্ত্রী থাকতে পারে।”
“আমি… আমি তার আইনি স্ত্রী ছিলাম না,” রুবি বললো। “কিন্তু আমরা অনেক বছর ধরে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে থেকেছি।”
মনে হলো এই মুহূর্তে জগতের সবচেয়ে হাস্যকর খবরটা আমাকে শুনতে হচ্ছে। আনিস কখনোই আমার মতো দেখতে আরেকটা মহিলার সাথে গোপনে পুরোপুরি ভিন্ন জীবন কাটাতে পারে না। এমন কিছু করার ওর সময় ছিল নাকি?
“আনিস আমাকে বলেছিল যে ও বিয়েতে বিশ্বাস করে না,” তীক্ষ্ম কণ্ঠে সে বলে চলল ” তোমার ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। আমি তো পুলিশকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম কারণ আনিস যে রাতে বাসায় আসার কথা ছিল ওই রাতে সে বাসায় এলো না। তারপর… তারপর পত্রিকায় তার মৃত্যু সংবাদটা দেখলাম।” মহিলাটার কণ্ঠ ধরে গেছে বলে মনে হলো। চোখেও মনে হচ্ছে পানি জমে আছে। ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম। “পত্রিকা থেকেই তোমার ব্যাপারে প্রথম জানতে পারি । সংবাদে তোমার নাম আর ঠিকানা দেয়া ছিল, আর… তাই আমি এখানে এসেছি।”
মহিলাটার কথার কী উত্তর দেব জানি না। আমি বিশ্বাস করি না যে আনিস দুটি জীবন কাটাচ্ছিল। এটা একেবারেই সম্ভব না।
“তুমি আমাকে এসব কেন বলছ?” আমি জানতে চাইলাম।
রুবি মাথা নুইয়ে ফেললে তাকে আমার কাছে আরও বয়স্ক মনে হলো। প্রথমে ভেবেছিলাম মহিলাটা আমার মতোই বয়সী, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
“আনিস মারা গেছে। আর যেহেতু তুমি ওর আইনি স্ত্রী, তুমি ওর সব সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছো। আমি কিছুই পাইনি।”
অবশেষে বুঝতে পারলাম মহিলাটার আসল উদ্দেশ্য। মহিলাটা টাকা চাচ্ছে।
“আমি দুঃখিত,” যতটা সম্ভব শীতল কণ্ঠে বললাম, “আমি জানি না এটা কী ধরনের প্রতারণা, কিন্তু আনিসের একটাই স্ত্রী ছিল, আর সেটা আমি। তোমাদের মধ্যে যা কিছু ছিল— যদি কিছু থেকে থাকে— তাহলে তা অবশ্যই অতীতের ব্যাপার। এর সাথে আমার বা আমার স্বামীর আর কোনো সম্পর্ক নেই। আইনি দিক থেকে, তোমার এক টাকাও পাওয়ার অধিকার নেই।”
দরজার হাতল ধরে তা বন্ধ করার প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু দরজাটা বন্ধ করার আগেই ও আমাকে এমন কিছু বললো যা আমাকে স্তব্ধ করে দিলো:
“আনিস আর আমি… আমরা একসাথে অনেক সন্তানও জন্ম দিয়েছি।”
অধ্যায়- ৮
হোয়াট দ্যা হেল? রুবির সাথে আনিসের সন্তান আছে? তাও অনেকগুলো!
আমার পুরোটা শরীর কেঁপে উঠলো, আর… প্রচন্ড বমি বমি ভাব শুরু হলো। বোধহয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটার উপরই সবটুকু বমি ছেড়ে দিতে হবে।
“তুমি মিথ্যা বলছো,” কথাটা কোনোমতে বলতে পারলাম!
সে সুপারসনিক গতিতে তার মাথা নাড়ালো। “ও আমাকে বলেছিল যে আমাদের জন্য উইলে ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি যে কোনো উইলই নেই। সবকিছু তোমার কাছে চলে গেছে। আর এদিকে… এদিকে আমাদের এখন পথে বসতে হবে।”
বলার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। এত কান্না পাচ্ছে। যদি এই মহিলা সত্যিই ঠিক বলে থাকে—যদি সত্যিই আনিসের সাথে এর একাধিক সন্তান থেকে থাকে, তাহলে তো তাদেরও আনিসের বিশাল সম্পত্তির কিছু অংশ পাওয়ার অধিকার আছে।
কিন্তু পুরো ব্যাপারটা আমি কিছুতেই কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। আনিস তার ব্যবসার কাজে অনেক ব্যস্ত থাকতো। প্রায়ই ওকে এখানে সেখানে ভ্রমণ করতে হতো। তবুও আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে সে একইসাথে অন্য একটি পরিবারের সাথে পুরো একটি গোপন জীবন কাটাতে পারলো।
“এই যে তোমাকে দেখাচ্ছি।” রুবি তার পার্সে খোঁজাখুঁজি করে একটা ফোন বের করলো। তারপর কিছুক্ষণ স্ক্রিনে স্ক্রল করে ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে ধরলো, “এটা আমাদের ছবি।”
আমি ফোনের স্ক্রিনে থাকা ছবির দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকালাম। যা দেখতে পাচ্ছি তা কি সত্যি? মনে হচ্ছে আমার পায়ের নিচের মাটি যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে আনিস আর রুবি গালে গাল লাগিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেই সুপারশপে দেখা লোকটা হয়তো আনিস ছিল না। কিন্তু ছবির এই লোকটা যে আনিস এ নিয়ে আমার মনে আর কোনো সন্দেহ থাকলো না।
আর বেজন্মাটা আমাকে সবসময় বলত যে সে সেলফি তুলতে পছন্দ করে না।
রুবি আবার স্ক্রিনে আঙুল চালালো। এবার যে ছবিটা সে দেখালো তাতে আনিস ছোট্ট একটা শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আর গর্বিত দৃষ্টি নিয়ে মিটিমিটি হাসছে। খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম ছোট্ট সেই শিশুটার চেহারার সাথেও আনিসের চেহারা যথেষ্ট মিল।
কিছুতেই বুঝতে পারছি না কীভাবে এটা সম্ভব। আমরা সপ্তাহে অন্তত চার বা পাঁচবার একসাথে রাতের খাবার খেতাম। যখন সে আমাকে বলত যে ডিনারের পর সে হাঁটতে বের হচ্ছে, তখন কি আসলে সে অন্য একটা পরিবারের সাথে রাতের খাবার খেতে যেত?
কিন্তু শুধু ছবিটা আসল মনে হচ্ছে বলে ঘটনাটাও যে সত্যি হবে ব্যাপারটা তো এমন নাও হতে পারে। ব্যাপারটা খুব ডিজিটাল কোনো স্বড়যন্ত্র হতে পারে। ফটোশপ বা এ,আই দিয়ে এখন কতকিছু করা যায়!
“এখনো আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই না?” সে বলে।
“তোমার কথা বিশ্বাস করা খুব কঠিন। এসব কিছুতেই সত্যি হতে পারে না।” আমি ওর কথা স্বীকার করলাম।
সে আমার হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে পার্সে ফেলে দিলো। আমি লক্ষ্য করলাম আমার পার্সটায় যেখানে গুচির লোগো লাগানো তখন ওর পার্সটা কাপড়ের তৈরি।
“তুমি কি বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে চাও?” সে জিজ্ঞেস করে।
আমার মনে হচ্ছে এই মহিলার সাথে কোথাও যাওয়া উচিত হবে না। হতে পারে সে সত্য বলছে। এটাও হতে পারে এই মহিলা মানসিকভাবে অসুস্থ। অথবা হয়তো কোনো সিক্রেট এজেন্ট। আমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে ফেলবে।
আমি কী ভাবছি এটা হয়তো সে বুঝে ফেলেছে। সে আরো বললো, “তুমি আমার সাথে না এসে আলাদা করে যেতে পারো। আমি তোমাকে ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি।”
আমি বুঝতে পারছি না কী করব। হতে পারে এই মহিলাটা আমার জন্য একটা ফাঁদ পেতেছে। এর পেছনে হয়তো অনেক বড়ো কোনো পরিকল্পনা আছে। কিন্তু… রুবিকে দেখে মোটেও বিপজ্জনক মনে হচ্ছে না। এই মহিলাটার দুঃখ সত্যিই বাস্তব মনে হচ্ছে। “আমি জানি না…”
রুবি তার পার্স থেকে একটা কাগজের টুকরো আর একটা কলম বের করে ঠিকানা লিখে দিলো। “দয়া করে এসো। যদি তুমি আনিসকে সত্যিই ভালোবেসে থাকো, তাহলে আমি আশা করছি তুমি ওর সন্তানদের ক্ষুধার্ত থাকতে দেবে না।”
উত্তরের অপেক্ষায় সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। “না, আমি যাবো না।”
“ধন্যবাদ,” রুবি হতাশ কণ্ঠে বলে উঠলো। “তবে আমি বিশ্বাস রাখি তুমি ন্যায় কাজটা করবে।”
কথাগুলো বলেই সে উল্টো ঘুরে চলে গেল।
