ওয়ালমার্টে কাজের সূত্রে

ওয়ালমার্টে কাজের সূত্রে

ওয়ালমার্টে কাজের সূত্রে আমার মায়ের বেশ কিছু ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানী বান্ধবী আছে। তাঁদের মধ্যেই একজন আছেন যিনি এবং তাঁর স্বামী দুইজনই রিটেইলে চাকরি করেন, এবং তাঁদের সংসার চালান।

আমেরিকায় রিটেইলে ছোটখাটো চাকরি করে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর, কারন এদেশে খরচ অনেক অনেক বেশি। কিন্তু এর ফাঁকেও ভদ্রমহিলা নিজের টাকা জমিয়ে দেশে নিজের ভাই ও বোনের জন্য টাকা পাঠান।

- Advertisement -

স্বামী শুনলে রাগ করে, তাই স্বামীকে জানতে দেন না। নিজেও সরাসরি টাকা পাঠান না। নগদ টাকা আম্মুকে দেন, আম্মু এসে আমাকে দেয়, আমি পাঠাই। তারপরে কনফার্মেশন নাম্বার নিয়ে আম্মুকে দেই, আম্মু ভদ্রমহিলাকে দেন, তিনি আম্মুর ফোন থেকে তাঁর ভাই/বোনকে হোয়াসস্যাপে কল করে মুখে মুখে সেই রেফারেন্স নাম্বার দেন যাতে ওরা গিয়ে টাকা তুলতে পারে। খুবই অর্গানিক সিস্টেম। স্বামী টেরও পায় না।

বিরোধিতার কারনে স্বামী বেচারাকে দোষ দেয়া যায়না। এদেশে প্রতিটা পয়সার জন্য মানুষকে পরিশ্রম করতে হয়। যদি কিছু বাড়তি টাকা সংসারে জমে, তাহলে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়া যায়। নাহলে দম ফেলার উপায় নেই। তাছাড়া, এইটা বিশ্বব্যাপী পরীক্ষিত সত্য যে আপনি আপনার আপনদের জন্য কলিজা কেটে দিলেও ওরা সেই কলিজায় মসলা কেন কম হলো, লবণ কেন বেশি হলো ইত্যাদি নিয়ে অভিযোগ করবেই। মানুষের চেয়ে অকৃতজ্ঞ প্রাণী দুনিয়ায় খুবই কম আছে।

তবু ভদ্রমহিলা বলেন, “আমার ভাইবোন দেশে না খেয়ে থাকলে আমি বড় বোন হিসেবে কিভাবে সহ্য করবো?”

একই ঘটনা আম্মুর অন্যান্য বান্ধবীদের ক্ষেত্রেও। তাঁরাও স্বামীকে না জানিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেশে নিজের আত্মীয়দের সাহায্য পাঠিয়ে থাকেন। বিনিময়ে তাঁরা শুধু আশা করেন, তাঁরা ভাল থাকুক।

আহ! “বড় বোন!” আমি আমার মাকেও একই ভূমিকায় দেখেছি, আমার বোনকেও দেখেছি, আমার ফুপুকেও দেখেছি।

আমার শ্বাশুড়িও একই, নিজের ভাইয়ের ছেলেকে নিজের আপন সন্তানের চেয়েও হয়তো বেশি ভালবাসতেন (আমার বউ এবং তাঁর বড় বোনের সেটাই ধারণা)। এখনও উনার “ভাইজান” কিছু বললে উনি জাগতিক সবকিছু ভুলে ছুটে যান। আমার শ্বশুরের ক্যানসারে আমার বৌকে যে পরিমান ছুটাছুটি করতে দেখছি আমার শ্বশুর ঘোষণাই দিয়েছেন যে তাঁর দশটা ছেলে হলেও সে এতটা করতো না।

আমি নিশ্চিত এই একটা গুণ বাংলাদেশি, ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানী মেয়েদের মধ্যে সমানভাবে আছে। নিজের শেকড় ছেড়ে তাঁরা অন্য ঘরে জীবন কাটিয়ে দেয়, তারপরেও মন পড়ে থাকে ফেলে আসা পরিবারের কাছে। কোনভাবে, কিছু একটা যদি ওদের জন্য করা যায়!

অথচ এই মায়ের জাত জন্মের সময়ে আমাদের সেই দেশগুলোতে বাবা মায়ের মুখ অন্ধকার হয়ে যায়! আমরা মনে করি শুধু ছেলেরাই সংসার টানে, তাঁদের ছোট বড় অবদানকে আমরা সামাজিকভাবেই অস্বীকার করি।

আমরা কতটা অকৃতজ্ঞ প্রাণী!

“যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তারা মুখ কাল হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে, না তাকে মাটির নীচে পুতে ফেলবে। শুনে রাখ, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।” (সূরা আন নাহল, আয়াত ৫৮-৫৯)

- Advertisement -

Read More

Recent