
যেদিন স্কুল ছুটির পরে আমার হাতে একটা সিকি থাকতো ,যাকে বলে চার আনা( এক টাকার চার ভাগের এক ভাগ),সেদিন নিজেকে ভীষন সৌভাগ্যবতী মনে হতো, আগে থেকেই প্লান করতাম কি কি কিনবো, সেই ছোট্ট বেলা থেকেই কেন যেন বাজেট করাটা শিখে গিয়েছিলাম।আমি ছিলাম ঢাকার আজিমপুর স্কুলের ছাত্ৰী, সময়টা আশির দশকের কিছু আগে। সেই সময় আজিমপুর, অগ্ৰণী, উদয়ন স্কুলের ভীষন সুনাম ছিলো,তাছাড়া একটা আদৰ্শ স্কুল বলতে যা বুঝায় সে সব ছিলো আজিমপুর স্কুলে,নিজস্ব দুটো লাইব্ৰেরী, মাঠের কোনে একটা ছোট্ট ফাষ্ট এইড দেবার জন্য মিনি হসপিটাল ,সায়েন্স ল্যাব (ছোট্ট ছোট্ট পায়ে সেই ল্যাবের কাঁচের দরজায় উঁকি দিলে দেখা যেত ওখানে একটা ঝুলানো কঙ্কাল, কেউ কেউ বলতো ওটা নাকি কোন এক দারোয়ানের কঙ্কাল, কি সহজেই তখন গল্প বিশ্বাস করে ফেলতাম!)টিফিন বানানোর ঘর,বিশাল মাঠ ( বেশীর ভাগ সময় ইন্টার স্কুল স্পোৰ্টস হতো আমাদের স্কুলের মাঠে ছুটির দিনে, সামারে হতো গাৰ্লস স্কাউট ক্যাম্প)।
স্কুলের বাইরে বিশাল গেট থেকে বের হ’লেই ডান দিকে ছিলো বাচ্চু ভাইয়ের ঠেলা যেখানে তেতুল থেকে চালতার আচার পৰ্যন্ত সব পাওয়া যেত,উনার পাশে ছিলো চটপটির ঠেলা সাথে দুটো ফোল্ডিং চেয়ার ; মোটে আট আনা দিয়ে বসে চটপঠি খাওয়া যেত যা আমার কাছে ঈদের মতো আনন্দের ছিলো যদি কখনো দুটো সিকি হাতে থাকতো !কখনো যখন দেখতাম বুট শেষের দিকে তখন একটু টকপানি চাইতাম ,সে স্বাদ এখনো জিবে লেগে আছে। ছিলো ঝালমুড়ির ঝাঁকা,আইসক্রিমের গাড়ী। পনেরো পয়সায় বড়ই,নতুবা বেতফল,নয়তো কৎবেল, জলপাই,নয়তো কাঠলিচু,অথবা কালোজাম,কখনোবা একটা আস্ত আমড়া এইসব,তারপরও হাতের মুঠিতে থাকতো দশটা পয়সা, বাড়ী ফিরে আসতাম একঝাক বালিকার সাথে হেটে হেটে , গরমের সকাল সারে দশটা কি এগারোটার মধ্যে পৌঁছে যেতাম বাসায় । সেই দশ পয়সায় একটা বরফ সাদা আইসক্রিম শুধু সেকারিন দেয়া (চিনির সাবসিটিউট) খেতে খেতে বাড়ীতে ফিরে আসতাম( কখনো ইচ্ছে হতো অন্য সব মেয়েদের মতো চারআনা দিয়ে একটা মালাই আইসক্রিম খাই, কিন্তু সেই অসামান্য অতিরিক্ত সিকিটি আমার কাছে কখনোই ছিলো না ,পরক্ষনেই মনে হতো মুঠিতে আছে মাত্র একটা সিকি,একে নিয়ে নয় ছয় ভাবা যাবে না ), এসে কোনোমতে ব্যাগটা রেখে, জামা পাল্টিয়ে ঐ যা কিনে এনেছি সেগুলি নিয়ে বসতাম,ঘরের একটু নুন কিংবা মরিচের ছিটায় সেটা হয়ে উঠতো অমৃত!আর মনে মনে ভাবতাম ,” কবে আমার কাছে আস্ত একটা একটাকা হবে ?” দিনগুলো চলে গেছে কিন্তু স্মৃতিটা কেমন যেন ক্ষতময় , শৈশবের স্মৃতি তো ! তাই সহজে শুকায় না ,কেমন যেন ফিরে ফিরে আসে।
বিণা নামের আমার এক বান্ধবী ছিলো আসতো মগ বাজার থেকে, হারিয়ে ফেলেছি, ভীষন মিস করি,হিমু আসতো আজিমপুর কলোনী থেকে, কিছু জিজ্ঞেস করলেই ছবি মেয়েটা কি দ্ৰুত উল্টো কথা বলে জবাব দিতো, এই যেমন এই অংকটা বুঝি না, কেমন করে করো ? ও বলতো,মিআ রিপা ,নেফিটি য়েঝিবু বোদি( মানে হ’লো শব্দ গুলোকে সব সোজা করলে যা হয়)। দিবার হাতের লেখা কি যে সুন্দর ছিলো, ক্লাস ফাইভে একবার আমাদের শিক্ষিকা ওর খাতাটা তুলে ধরো বল্লো,”দ্যাখ মেয়েরা এই হাতের লেখা দেখলেই পড়তে ইচ্ছে করে, তোমরাও পরিচ্ছন্ন ভাবে লিখতে চেষ্টা করো।”
এখন হাতের লেখা পরিচ্ছন্ন কিন্তু সেই আপা আর নেই! আবার সেলাই আপা সুস্মিতা কি সুন্দর করে সেলাই শেখালো, সব শিখেছি রিপু,তালি করা থেকে শুরূ করে নক্সা করা টেবিল ক্লথ পৰ্যন্ত কিন্তু আপাও আর নেই , মনে মনে সুই-সূতোয় আপার ছবি আঁকি অথচ জীবনের তালি জোড়া লাগাতে পারিনা।
বাচ্চু ভাইয়ের দোকানের সব আইটেম কিনে নিতে পারবো এখন কিন্তু আমার সেই ছোট্ট বেলার সিকিটার মতো কেনার আনন্দ উপভোগ করতে পারবো না , একশো টাকা প্লেটের চটপটির থেকে চেয়ে নেয়া টকপানির মতো স্বাদ নেই! মালাই আইসক্রিমের থেকে আমার নিত্য দিনের সাদা বরফের আইসক্রিমটাই পরম তৃপ্তিকর ছিলো কিন্তু সেইসব দিনগুলোতে ভাবতাম সময় এলে সব কিনে খাবো, সময় এসেছে, প্ৰিয় শিক্ষকদের কথাগুলো দেরীতে হলেও বুঝতে পেরেছি ভালো করে পড়তে পারলেই ভালো খাবো,ভালোভাবে বেচেঁ থাকবো কিন্তু কেউ কখনো বলেনি ,এই মেয়েরা তোমরা পড়ালেখার পাশাপাশি জীবনের প্ৰত্যেক অধ্যায় গুলোও সুন্দর করে উপভোগ করো, সব কিছু ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে নেই, কেননা ভবিষ্যত একটা অচেনা ট্ৰেন, সেটা আমরা বৰ্তমানে দেখতে পাইনা।
তিনতলায় ছিলো গানের ক্লাস,আপা বলতেন,গাও মেয়েরা আমার সাথে সুরে সুর মিলিয়ে,
“সোমবারে পাখিটির ডিম ছিলো দু’টি,
মংগলবারে দেখি গেছে তারা ফুটি,
বুধবারে যেয়ে দেখি সেই দুটি ছানা
গজালো তাদের গায়ে কচি কচি ডানা,
বৃহস্পতি বারে তারা ডানা দুটি মেলে
মা’র কাধে চেয়ে চেয়ে মিঠে বল খেলে,
শুক্রবারে এ উহাকে কয় ভোর হলে দেখা
যাবে আকাশে কি হয়?
শনিবারে গাছে গাছে ডালে ডালে ঘুরে
রবিবারে পাখি দুটি কোথা গেল উড়ে ?”
তখন মনে হতো কখন গানের ক্লাস শেষ হবে ? কি গান ? কিছুই বুঝিনা? আসলে এক কচিকাঁচার গানে জীবনের সব মানে বুঝানো হয়ে গেছে, কিন্তু গানের আপার সাথে ঠোঁট মিলিয়ে তোতা পাখির মতো শুধু গেয়েই যেতাম, আপাও মানে বুঝান নি আর আমরাও বুঝিনি,কিন্তু জীবন এখন স্বচ্ছ পানির মতো টলটলে , টিভির স্কিন ছাড়াই এখানে ক’তো শত স্মৃতি ভাসতে থাকে, আমার টুকটাক রুপোলী চুলের আড়ালে সেইসব সোনালী স্মৃতি আমাকে শুধু পিছু নিয়ে যায়, অচথ ছোট্ট বেলায় বলা হতো সামনে আছে সোনালী দিন !
কোথায় সোনালী দিন ? সামনে না পেছনে সেই হিসেব না করে আমি শুধু চোখ বন্ধ করে পেছনে হাটি,কিন্তু আমার ভিজে উঠা চোখ আমাকে বলে ,সামনে তাকাও,এখনো আরো পথ যেতে হবে। এখনো পাখির ছানার মতো জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘুরছি!
