ফেসবুকে ক্রমাগত টেক্সট ম্যাসেজ

ফেসবুকে ক্রমাগত টেক্সট ম্যাসেজ

আমার ফোনে, ফেসবুকে ক্রমাগত টেক্সট ম্যাসেজ, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি আসছে যে “যদিও ডালাস শহরটা এর লাগোয়া ফোর্টওর্থ শহর থেকে খুব বেশি বড় না, কিন্তু তারপরেও ডালাসের ক্রাইম রেট ৩০-৬০ গুন বেশি। এর প্রধান কারন ডেমোক্রেট বিচারকদের ঔদার্য্য। ফোর্টওর্থ কোর্টের বিচারকরা রিপাবলিকান, বিচারের ব্যাপারে ওরা কট্টরপন্থী বলেই ওখানে ক্রাইম রেট কম। তাই ডালাসকে বাঁচাতে হলে রিপাবলিকানদেরই ভোট দিতে হবে।

আমেরিকায় নির্বাচন এগিয়ে আসছে। তাই চারিদিকে এখন এই দুই পার্টির প্রচারণা চোখে পড়ছে। তার আগে এই দুই পার্টির প্রধান দুইটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরি।

- Advertisement -

রিপাবলিকানরা (ট্রাম্পের পার্টি) কনজারভেটিভ। খ্রিষ্টান ধার্মিক লোকজন ওদের সমর্থক। ওরা সমকামীদের পাপী মনে করে, ওরা ওদের এই “অধিকারের” বিরুদ্ধে। ওদের দৃষ্টিতে এবরশনও পাপ। “ভ্রুণহত্যা মানেই মানব হত্যা” – এই হচ্ছে ওদের নীতি। “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে বিশ্বাসী, এর মানে হচ্ছে বিদেশিদের চাকরি দেয়ার আগে আমেরিকানদের চাকরি দিতে হবে। আউটসোর্সিংয়ের খুব একটা ভক্ত নয়। ইউনিভার্সিটিতে গভর্নমেন্ট স্টাডিজ পড়ার সময়ে আমার প্রফেসর বলেছিলেন “আমরা প্রতিবছর লাখে লাখে নতুন ইমিগ্র্যান্ট আনছি, অন্যদিকে জবগুলো চায়না, ইন্ডিয়াতে নিয়ে যাচ্ছি। এইটা কি সুইসাইড নয়? শেষ কবে ওয়ালমার্টে “মেড ইন আমেরিকা” লেখা শার্ট কেউ দেখেছো? আমাদের পোশাক আসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তৈরী হয়ে।”

ইমিগ্রেশন নীতিতেও ওরা অনেক কনজারভেটিভ। অবৈধ অভিবাসীর বেলায়তো ওদের জিরো টলারেন্স পলিসি।

ডেমোক্রেটরা (বাইডেন-কামালা হ্যারিস) ঠিক এর উল্টো। ওরা উদারনীতিতে বিশ্বাসী। সমকামীরাও মানুষ, এবং ওদেরও কিছু সামাজিক অধিকার আছে। সেটা নিশ্চিত করে ডেমোক্রেটরা। সব ধর্মের মানুষের সমানভাবে বাঁচার অধিকার আছে আমেরিকায়, কাজেই সব ধর্মের মানুষ যেন শান্তিতে নিজ ধর্ম পালন করতে পারে, সেটাও নিশ্চিত করে এরা। ইমিগ্রেন্টদের ব্যাপারে ওদের নীতি হচ্ছে, আমেরিকা দেশটাই ইমিগ্রেন্টদের নিয়ে তৈরী, এখানে শুধুমাত্র নেটিভ আমেরিকান ছাড়া বাকি সবাই কোন না কোন সময়ে, কখনও না কখনও ইমিগ্রেন্ট হয়েই এসেছেন। কাজেই ওদের ব্যাপারে এত কঠোর হওয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে যারা আমেরিকায় আসে, তাঁরা একটা বিশেষ লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, স্বপ্ন নিয়ে আসে, রাষ্ট্রের উচিত সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়তা করা। রিপাবলিকানদের দৃষ্টিতে এসব স্বপ্ন টপ্ন সব ভুয়া, ওরাই ড্রাগ ডিল করে, ওরাই সেক্স ট্রাফিকিং করে, আমেরিকার যাবতীয় অপরাধের মূল ওরাই।

রিপাবলিকানদের সমস্যা হচ্ছে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা, যারা শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী, ওরা এই সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মুসলিম, ইহুদি, হিন্দু, কালো, ম্যাক্সিকান সবার উপর বুলি করার চেষ্টা করে। বর্ণবাদ বিপদসীমা অতিক্রম করে। ভাগ্য ভাল যে আমেরিকান পুলিশ এবং আইনি শাসনের কারনে ওরা লাগামছাড়া হয়না, তারপরেও ছোট বড় নানা দুর্ঘটনা দেশজুড়েই ঘটে। সিনাগগে হামলা, এশিয়ান (চীন-জাপান-কোরিয়া প্রভৃতি টানা চোখের অধিকারী দেশগুলোর নাগরিক) কমিউনিটির উপর হামলা, ম্যাক্সিকানদের প্রতি বর্ণবাদ, মসজিদে গুলি চালানো, বিভিন্ন মুসলিম দেশের নাগরিকের উপর নিষেধাজ্ঞা, বোরখাপরিহিতা রমণীর গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, ইহুদিদের সিনাগগে বন্দুক হামলা ইত্যাদি সব ট্রাম্পের শাসনামলে ঘটেছিল।

পাশাপাশি এবরশনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কট্টর হওয়ার কারনে রেপ ভিকটিমও ভ্রুন এবর্ট করতে পারেনা।

অন্যদিকে ডেমোক্রেটদের সমস্যা হচ্ছে বর্ডারে শৈথিল্যের কারনে আসলেই বিদেশী বহু ক্রিমিনাল আমেরিকায় ঢুকে পড়ে। ফলে দেশের মানুষের নিরাপত্তার ব্যাঘাত ঘটে। এলজিবিটিকিউ কমিউনিটিও মাঝে মাঝে নিজের গন্ডি ছাড়িয়ে যায়, বহু ডেমোক্রেট স্টেটে স্কুল পর্যায়ের বাচ্চাদের রেইনবো প্যারেডে অংশ নিতে বলে, অপারেশন করে লিঙ্গান্তরের ব্যাপারেও সীমাতিক্রম করে।

তবে ভন্ড দুই দলেই আছে। এলজিবিটিকিউ ইস্যুতেও দেখা যায় বহু কট্টর রিপাবলিকান সমর্থক, প্রকাশ্যে ওদের গুষ্ঠি নাশ করলেও পরে প্রমাণিত হয়েছে গোপনে সমকামী সম্পর্ক চালিয়ে গেছে। অন্যদিকে বহু উদারপন্থী সমর্থক প্রকাশ্যে সাধু সাজলেও পরবর্তীতে দেখা গেছে ভিতরে ভিতরে ওরা ছিল ভয়াবহ বর্ণবাদী।

ট্যাক্সের ব্যাপারে রিপাবলিকানরা (ডোনাল্ড ট্রাম্প) ধনীদের আরও ধনী বানাতে আগ্রহী। মানে, বড় বড় কর্পোরেশন বড় বড় ট্যাক্স কাট পায়। যুক্তিটা শক্তিশালী। বড় কোম্পানি ট্যাক্সের টাকা বাঁচালে ওরা আরও বিভিন্ন প্রজেক্টে সেটা ইনভেস্ট করবে, এবং এর ফলে আরও নতুন নতুন বহু চাকরির সুযোগ তৈরী হবে।

ডেমোক্রেটরা গরিবের ট্যাক্স বাঁচানোর জন্য বেশি মরিয়া। গরিবের ট্যাক্স বাঁচলে সে নিজের পরিবারের পেছনে খরচ করবে, একটু ভাল জীবন যাপন করবে।

তবে ফিলিস্তিন-ইজরায়েল ইস্যুতে দুই পার্টিই একদম কট্টরভাবে ইজরায়েলের সমর্থক। দুই পার্টিই একটা আরেকটার সাথে কামড়াকামড়ি করে যে কে কত বিলিয়ন ডলার আর অস্ত্র নিয়ে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়াতে পারবে। দুই দলই বলে “ইজরায়েলের

আত্মরক্ষার অধিকার আছে।”

“তাহলে কি ফিলিস্তিনের আত্মরক্ষার অধিকার নেই? ওদের জন্মই হয়েছে মরার জন্য?” জিজ্ঞেস করা হলে ওরা আমতা আমতা করে।

বন্দুক আইন নিয়েও দুই পার্টিই একইভাবে লড়ছে, কে কতভাবে এই আইন শিথিল করতে পারে যাতে আমেরিকানরা আরও বেশি বেশি আরও আধুনিক বন্দুক আরও সহজে কিনে বাড়ি ভরে ফেলতে পারে। কোন এক উন্মাদ সন্ত্রাসী মেশিনগান হাতে সাধারণ মানুষ, স্কুলের শিশু হত্যা করে ফেললেও দোষ ঐ মানুষটার আর ভিডিও গেমসের; কোন অবস্থাতেই বন্দুকের সহজলভ্যতার নয়।

স্টুডেন্ট লোন-চিকিৎসা খরচ-হোমলেস ইস্যু-ক্ষুধা-স্কুল শিক্ষকদের বেতন ভাতা ইত্যাদি নিয়েও দুই পার্টির কোনই মাথা ব্যথা নেই। অথচ এগুলোর সমস্যার সমাধান করা আমেরিকার জন্য কোন বিষয়ই না। ইজরায়েল আর ইউক্রেনে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাঠানো হয়, তার ভগ্নাংশেই এসব সমাধান করে ফেলতে পারতো। এ থেকেই বুঝা যায়, সরকার চায়না এই সমস্যার সমাধান হোক। অন্ধকারের অস্তিত্ব না থাকলে লোকে আলোর কদর করবে?

একটা কথা সত্যি যে যেই পার্টিই ক্ষমতায় আসুক, চেকস এন্ড ব্যালেন্স নীতির কারনে আমেরিকার সামগ্রিক পরিস্থিতির খুব একটা বড় পরিবর্তন আসেনা। সরকার চাইলেই স্বৈরাচারী হতে পারেনা, পুলিশ চাইলেই ঘুষ খেতে পারেনা, সংখ্যাগুরুরা চাইলেই সংখ্যালঘুর জমি দখল করতে পারেনা। দেশ চলে আইনের অধীনে, কেউই আইনের উর্দ্ধে নয়।

তা উপরে যা যা বর্ণনা করলাম, এসবের উপর ভিত্তি করেই লোকে নির্বাচনে ভোটাভুটি করে। কেউ ভোট করবে শুধুমাত্র এলজিবিটিকিউ অথবা এবরশন ইস্যুতে দুই পার্টির অবস্থানের কারনে। কেউ করবে ট্যাক্সের দিকে তাকিয়ে। দলকানা সমর্থক এদেশেও আছে, সংখ্যায় কোটি কোটি। টেক্সাস যেমন রিপাবলিকান সমর্থকে ভরপুর।

করোনা ভাইরাসের সময়ে ট্রাম্প নিজে টিকা নিলেও শুধুমাত্র রিপাবলিকান সমর্থক বলেই কোটি কোটি রিপাবলিকান কোন রকমের টিকা নেয়নি। শুধু করোনার ক্ষেত্রেই না, সাধারণ ফ্লুয়ের টিকাও ওরা অনেকে নেয়না। কেন? “জিসাস আমাদের রক্ষা করবে।” শুধু একরোখা ধর্মান্ধরই না, উচ্চশিক্ষিত মানুষেরাও এমন।

আমার আগের অফিসের বস, যে ছিল একজন সিপিএ, ওর বাবা মা দুইজনই শিক্ষক, সেও জীবনেও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেয়নি। আমি এবং আমার চাইনিজ কলিগের পাল্লায় পড়ে সে সেই বছর টিকা নিয়েছিল।

তো যা বলছি, আমারও আমেরিকান সরকারের প্রতি কিছু ইস্যু নিয়ে প্রত্যাশা থাকে। প্যালেস্টাইন ইস্যু এবং বন্দুকনীতি – এই দুইটাই প্রধান। সমস্যা হচ্ছে, এই দুইয়ের ব্যাপারেই আমার দুই ক্যান্ডিডেট একই অবস্থানে অবস্থান করে। আমার জন্য তাই অপশন হচ্ছে “তুলনামূলক কম বদমাইশকে” বেছে নেয়া।

আপনারা যারা যারা সিটিজেন আছেন, নিজের প্রার্থীকে নিজের প্রয়োজন ও উদ্বেগ বুঝে ভোট দিন। যদি দুই পার্টির বাইরে কোন থার্ড পার্টিকে ভাল লাগে, তবে ওদেরকেই দিন। তবুও ভোট দিন। কারন এইটা আপনার নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব।

- Advertisement -

Read More

Recent