
পাওয়ার — ইংলিশ শব্দ পাওয়ার বা বাংলা শব্দ ক্ষমতা সবখানেই দাপুটে। গল্পটা রাতের এবং গল্পটা কুকুরের। সেই সাথে গল্পটা মানুষের তৈরি টর্চ লাইটের।
জানালার উত্তর দিকে দশফুট চওড়া রাস্তা যেটি গেছে পূর্ব – পশ্চিমে। রাস্তার উপর পাশে তিনদিকে দেয়াল ঘেরা এক টুকরো খালি জায়গা আছে এবং রাস্তার দিক খোলা। ওই খালি জায়গায় তিনটি নারিকেল গাছ, চারটি সুপারি গাছ, চারটি মেহগনি গাছ, একটি আম গাছ আর দুটি পেয়ারা গাছ আছে। আশেপাশের বাড়িতেও কিছু নারিকেল গাছ, কাঁঠাল গাছ, আম ও সুপারি গাছ আছে। কাজেই পুরো মহল্লায় সকাল থেকে পাখিদের উড়াউড়ির সাথে কাঠবিড়ালির লেজ উঁচিয়ে ছুটে চলা দেখতে ভালোই লাগে। ২০২৩ খ্রীষ্টিয় সালের ডিসেম্বরে এক সকালে দেখি এক এক করে দেয়াল ঘেরা জায়গার গাছগুলো মাটিতে পতিত হতে লাগলো। ওই জায়গার মালিক সৌদি আরব প্রবাসী, তিনি এখানে বাসা বানাবেন। তাই গাছগুলো কুড়ালের আঘাতে ধরনী তলে লুটিয়ে পড়লো। আমার খারাপ লাগলো। জানালা খুলে দাঁড়িয়ে থেকে আর কাঠবিড়ালির ছুটাছুটি দেখতে পারবো না।
দেখতে দেখতে অনেকগুলো পিলার দাঁড়িয়ে গেল। একসময় সিঁড়ি হলো এবং পিলারের উপর ছাদ হলো। ঘরের দেয়াল অর্থাৎ ইটের গাঁথুনি পরে হবে। সৌদি আরব প্রবাসীর হয় ছুটি শেষ অথবা আপাতত আর টাকায় কুলুচ্ছিলো না, তাই তিনি বাসার কাজ ওই সিঁড়ি ও ছাদ পর্যন্ত করে আবার চলে গেছেন সৌদি আরব। তিনি যাবার আগে তার জায়গার মালিকানার পাওয়ার খাটিয়ে হাজার হাজার পোকা, শতোশতো প্রজাপতি ও ফড়িং, কিছু ফিঙে, কিছু কাঠবিড়ালি, বুলবুলি, কাঠঠোকরা ও চড়ুইদের আশ্রয় বিনাশ করে নতুন এক জঞ্জাল তৈরি করে গেলেন আমার জন্যে। রাত আনুমানিক তিনটা। হঠাৎ কুকুরের ঘেউঘেউ চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। একটি বা দুটি কুকুর নয়। ওদের চিৎকার শুনে বুঝতে পারছি অনেকগুলো কুকুর একত্রে তাদের জরুরি অধিবেশনে মতামত তুলে ধরছে। কিন্তু ; একই স্বরে ও একই সুরে চিৎকার চলছে, তাই ঠিক বুঝা যাচ্ছে না ওই সভাস্থলে রাজাদল ও প্রজাদল আলাদা নাকি ওরা এক-ই। কিন্তু ; ওদের ওই অধিবেশনে মনোযোগ দিলে আমার চলবে না। আমার ঘুমের দরকার। তাই টর্চ লাইটটা হাতে নিয়ে পাশের দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দেখলাম। অন্ধকারে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না কুকুরের দলের অবস্থান কোথায়। ডানে বামে তাকিয়ে তারপর যেই তাকিয়েছি সৌদি আরব প্রবাসীর নতুন অসম্পূর্ণ বাসার ছাদে তখনই আমার চোখে ধরা দিলো ছাদের উপরে জোড়ায় জোড়ায় বারো জোড়া চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমি প্রথমে হেৎ হেৎ শব্দ করে ওদের তাড়াতে চাইলাম। আমার হেৎ হেৎ শব্দে ওরা শব্দ করা বন্ধ করলো বটে, কিন্তু ; অনড়ভাবে এদিকে তাকিয়ে রইলো ওদের বারোজোড়া জ্বলজ্বলে চোখে। এইবার আমি আমার হাতের একটি টর্চের আলো ছুঁড়ে দিলাম ওদের দিকে। স্বাভাবিক কারণেই ছোটোবড়ো মিলিয়ে বারোটি কুকুরের বারো জোড়া চোখের সামনে আমার টর্চের আলো বেশি আলো ছড়ালো। টর্চের আলো দেখে এতোটা সময় অন্ধকারে রাজত্ব করা শান্তি প্রিয় মানুষের ঘুম নষ্টকারী কুকুরের দল ঘেউঘেউ না-করে এবার তাদের দলের দলপতির নেতৃত্বে সমস্বরে কুঁইকুঁই আওয়াজ করতে করতে সৌদি আরব প্রবাসীর ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে রাস্তায় এসে লেজ গুটিয়ে পশ্চিম দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
কুকুরের দলকে তাড়াতে পেরে আমার মাথায় অল্প সময়ের জন্যে দখল ও পাল্টা দখলের রাজনৈতিক দর্শন ধরা দিলো। দেশে দেশে মানুষের মাঝে চলছে শক্তির মহড়া, অস্ত্র আর পাওয়ারের গল্প লেখা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখানেও দেখলাম পাওয়ারের খেলা। পাওয়ার বা ক্ষমতার দাপট চলছে সবখানে। সংখ্যায় বেশি হলেই হয় না। পাওয়ার বা ক্ষমতা বা আলো কতোটা উজ্জ্বল সেটাও বিবেচ্য বিষয়। এখানে অন্ধকারে বারো জোড়া চোখের জ্বলজ্বল করা আলো একটি মাত্র টর্চ লাইটের কাছে হেরে গিয়ে কুকুরের দল তাদের বিশেষ অধিবেশন মুলতবি করে জীবন বাঁচাতে সভাস্থল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
কুকুর ও টর্চ লাইটের গল্পের সাক্ষী হওয়ার পরে আমার চোখের ঘুম গেছে পালিয়ে। ভাবছি, একটি টর্চ লাইটের পাওয়ারে যদি অন্ধকারে রাজত্ব করা বারোটি কুকুর তাড়ানো গেছে ; তাহলে একটি গুল্লি ভর্তি অস্ত্রের পাওয়ার যদি আমার আয়ত্তে আসে তাহলে-তো আমার পাওয়ার আর-ও বেড়ে যাবে। তখন ওই ‘শালা কছিমুদ্দি’ তার লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে আর এই এলাকায় অন্যায় ভাবে সবাইকে ভয় দেখিয়ে নিজের পাওয়ার দেখাতে পারতো না। কিন্তু ; এমন পাওয়ার দেখানোর ট্রেনিং আমি নিইনি। কাজেই এ আমার দ্বারা হবে না। এটা কোনো মঙ্গলময় কাজ-ও নয়। ভাবতে ভাবতে সময় ‘সুবহে সাদিক’। আমার কানে আসে আযানের ধ্বনি — “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার… “। আমি অর্থ জানি, তাই পাওয়ারের গল্পের চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে আমি বলি, ” আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ…”। কাছের মসজিদ থেকে ভেসে আসে সুমিষ্ট কন্ঠে ফজরের আযান। আমি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে বারান্দা থেকে ঘরে যাই। আমার কানে আসে “হাইয়া-আলাছ্ছালা হাইয়া-আলাছ্ছালা, হাইয়া-আলালফালা হাইয়া-আলালফালা”।।
