
পাঠক, আসুন কয়েকটি গানের কথা স্মরণ করি। আপনার অথবা প্রতিবেশীদের কারো বাড়িতে বিয়ের উৎসব। আপনার কানে আসছে একটি গান – হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ…। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যারের লেখা শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠের এই গানটি শোনামাত্র আমাদের প্রাণে কীরকম উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল, মনে আছে!
বর্ষাকালে বাংলাদেশের কোন গ্রামের চারিদিকে থৈথৈ করা পানি। সেই গ্রামের পাশে হাওরের পানিতে ভেসে চলেছে কয়েকটি পালতোলা নৌকা। এর মধ্যে রঙিন পানসি নৌকার ভিতরে বন্ধুপরিবেষ্টিত হয়ে মুখে রুমাল দিয়ে বসে আছেন এক লাজুক নওশা। তার হাতের আঙুল মেহেদি রঙে রাঙানো। সাথে আছেন পরিচ্ছন্ন কাপড়ে উদ্দীপনাপূর্ণ বৈরাতিরা। সেই নৌকার পালতোলার মাস্তুলে দড়ি দিয়ে বাঁধা দুই দিকে মুখ করা মাইক থেকে ভেসে আসছে একটি গান- কেহই করে বেচাকেনা কেহই কান্দে / রাস্তায় পড়ে, ধরবি যদি তারে / চলো মুর্শিদের বাজারে। হুবহু এরকম দৃশ্য না হলেও গানটি আপনার কি মনে আছে?
গীতিকার জামাল শাহ-র লেখা ও অবিস্মরণীয় শিল্পী আব্দুল আলীমের কণ্ঠে এই গান কি বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভুলে যেতে পারে!
ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যারের লেখা সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে – অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান, যেন ভুলে যেওনা / একি বন্ধনে, বাঁধা দুজনে / এ বাঁধন ছিঁড়ে যেওনা গানটির কথা মনে আছে? এই গান একবার শুনলে, কেউ কি ভুলে যেতে পারে!
মনে করুন এলাকার বড় রাস্তা ধরে আপনি বাজারে যাচ্ছেন। সহসা পিকনিকের ব্যানার টাঙিয়ে আপনার পাশ দিয়ে চলে গেলো সুন্দর একটি বাস। ভিতরে আনন্দের কোলাহল। বাসের উপরে সামনে-পেছনে মুখ করা দুইটি মাইক। সেই মাইকে বেজে চলেছে একটি গান- আরে ও প্রাণের রাজা, তুমি যে আমার / পাশে পাশে থেকো মোর / চাইনা কিছু আর। মনে পড়ে? দুই প্রেমিক প্রমিকার প্রাণ উজাড় করা গান। গানটিতে কণ্ঠ দিতে চট্টগ্রাম থেকে দুই শিল্পীকে ডেকে পাঠিয়েছেন সুরকার। এই গানে প্রেমিক প্রেমিকার ভূমিকায় কণ্ঠ দিয়েছেন আপন ভাইবোন : প্রবাল চৌধুরী ও উমা খান৷ গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচিত এই গান শুনলে এখনো কি আপনার প্রাণে আনন্দের হুল্লোড় বয়ে আনে মুহুর্তেই।
ঘোষক রেডিওতে ঘোষণা করছেন : এবারের গানটির গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন শিল্পী সুবীর নন্দী। হাঁটা থামিয়ে কান উৎকীর্ণ করে নিমগ্ন হয়ে আপনি গানটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনলেন- কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো / সে কথা তুমি যদি জানতে…! রেডিওতে বাজানো গানটি শেষ হয়েছে। আপনার আমার জীবনের অনেক জল গড়িয়ে গেছে অজানার ভাটিতে। ইতোমধ্যেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন গানটির গীতিকার ও শিল্পী! কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে ঠিকই রয়ে গেছে অনেক দিন আগে শোনা ভালোলাগা সেই মুহূর্তটির অবিশ্রান্ত অনুরণন।
গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের মিছরির দানার মিষ্টি কণ্ঠের সেই গানটির কথা একটু স্মরণ করুন- ঢাকো যতনা নয়ন দু’হাতে / বাদল মেঘ ঘুমাতে দেবে না…।
ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান রচিত এই গানটিও কি আপনার মনে গেঁথে আছে!
ভাবলে অবাক হতে হয়, শতসহস্র গানের মধ্যে এইসব স্মৃতি জাগানিয়া ও প্রাণহরণিয়া কিছু গান কেমন করে মানুষের হৃদয়ে আলাদাভাবে জায়গা করে নেয়!
কী আছে এইসব গানে? জীবনবোধে পূর্ণ বাণীর গভীরতা? প্রেম পিয়াসী মনের চিত্রময় গল্প? ঝর্ণার মতো স্বচ্ছ ও মধুর মতো মোহনীয় কণ্ঠ? নাকি, এই সবকিছুর সাথে অদৃশ্য এক যাদুকরী সুর! পাঠক, উপরে বর্ণিত গানগুলো আবার স্মরণ করুন। এক ঘোরলাগা অতীত আপনাকে সমকালীন জটিল জীবন থেকে কিছুটা মুক্তি দিচ্ছে?
এইসব অবিস্মরণীয় গান সহ আরো শত শত গানের সুর করেছিলেন প্রখ্যাত সুরকার আলী হোসেন। বাংলা উর্দু মিলিয়ে প্রায় একশত ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন।
বাংলাদেশের গানে সোনালী অতীতের এক অন্যতম সুরকার আলী হোসেন। তিনি আমাদের গানের জগতের এক গর্ব।
সুরকার আলী হোসেন আগামী ২৩মার্চ ২০২০ সালে আশি বছরে পা রাখবেন। একজন মানুষের জীবনে আশি বছর পূর্ণ করা দীর্ঘ জীবনের সামিল। যদিও লক্ষকোটি শ্রোতার হৃদয়ে ভালোলাগার একটি স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন তিনি। এটি অবশ্যই একজন সুরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ও তৃপ্তিদায়ক অর্জন। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তিনি তাঁর প্রাপ্য ও উপযুক্ত সম্মান পাননি।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমার বিনীত নিবেদন সুরকার আলী হোসেন সাহেবকে একুশে পদকে ভূষিত করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আমি সনির্বদ্ধ আবেদন জানাই।
মহান সুরকার আলী হোসেন দীর্ঘজীবী হোন। তাঁর প্রতি আমার অফুরান শ্রদ্ধা ও উষ্ণ শুভেচ্ছা।
টরন্টো, কানাডা
