কানাডাতে নেই মরুভূমি

কানাডাতে নেই মরুভূমি

কানাডাতে পাহাড়-পর্বত, নদী-সাগর কোন কিছুরই কমতি নেই। শুধু একটা জিনিসই আগে কখনও পাইনি তা হল মরূভূমি। ইউকুনে তাও পেয়ে গেলাম। বড় সাইন দিয়ে ল‍্যান্ডমার্ক “Carcross desert” -World’s smallest desert

গতরাতের ভয়াভহ অভিজ্ঞতার পর সকালে ঘুম ভাঙল গাড়ির উইন্ডশিল্ড উপর একটা কয়োটি “Coyote” দেখে। উপর থেকে আমাকে দেখছে, ভিতর থেকে আমি । তাও কপাল ভালো যে ঘুম থেকে উঠে দেখি নাই যে ভাল্লুক বসে আছে। আর এদিকেতো গাড়ি একবার বন্ধ হলে আর স্টার্ট হয় না। ঠান্ডায় গাড়িতে বসেই অপেক্ষা করছি কখন কোন একজনকে পাব আর একটু ব‍্যাটারি বুস্ট নিয়ে গাড়ি স্টার্ট করতে পারবো।

- Advertisement -

গতরাতে দুই জায়গায় ফোনে যোগাযোগ করেছিলাম, এক এয়ার বিএনবি, আর দুই গাড়ি ঠিক করার জন‍্য সিএএ (CAA) এর কাস্টমার সার্ভিসে। এত রিমোট জায়গায় সিএএ পরের দিন দুপরের আগে আসতে পারবেনা কিন্তু AirBnB আমাকে ভালো সাপোর্ট দিল। ওইদিন রাতের বুকিং রেন্টতো ব‍্যাক করে দিয়েই দিল আর সাথে আরও একদিনের হোটেল ভাড়া বাড়তি দিবে। যাক তাতে অবশ‍্য মনের দুঃখ কিছুটা প্রশমিত হল ।

যেখানে আমাদের গাড়ি রাখা সেখানে আজকে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, এজন‍্য মোটামুটি সকাল ৭ টার দিকেই দুএকটা গাড়ি চলে আসছে। ওদের থেকে সাহায্য নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলাম, মনে হল অনেক বড় একটা বোঝা নেমে গেল। এবার গাড়ি নিয়ে পাঁচ মিনিট দূরে সোজা কারক্রস এর ভিজিটর সেন্টার। ওখানে গিয়ে ফ্রেস হয়ে কিছু ভ্রমন বিষয়ক তথ‍্য নিয়ে নিলাম। ততক্ষণে ছোট্ট এই শহরের দোকানগুলোও খোলা শুরু হয়েছে। গতকাল রাত থেকে না খেয়ে আছি । পাশের রেস্টুরেন্টে গিয়ে পারলে গতকালের খাবার সহ খেয়ে নিলাম। আজকে ঘুরাঘুরির দিক দিয়ে বিশাল এক ব‍্যস্ত দিন যাবে আমাদের, শুধু আবহাওয়াটা সাপোর্ট করলেই হয়। পাহাড়ি এলাকায় খুব দ্রুতই আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে যায়। রেলওয়ে স্টেশন, কেরাব‍্যু ক্রসিং ব্রিজ, আর্ট সেন্টার, শত বছরের পুরোনো গিফ্ট শপ আর ছোট ছোট দোকানগুলো মিলে কি যে ছবির মত সুন্দর একটা শহর। শুধুমাত্র গরমের এই কয়েক মাসই এই দোকানগুলো খোলা থাকে, বাকি শীতের ছয় সাত মাস বন্ধ। এজন‍্য এইদিকে সবকিছুর দামই অনেকটা বেশি।

এবার তাহলে ঘুরাঘুরি শুরু করা যাক। প্রথমেই গেলাম সেই বিখ্যাত পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট মরুভূমি “Carcross desert” দেখতে। একেবারে রাস্তার পাশেই গাড়ি রেখে হাঁটা শুরু করা যায়। মাত্র তিন বর্গ কিমি আয়তনের এই মরূভূমি, কিন্তু আমার অনুভতি একেবারে সাহারা মরুভূমির দেখার মত- উচুঁ নিচু বালির ঢাল, তার উপর কিছু লতানো, কিছু কাঁটা ও ঝোপ জাতীয় গাছ। বরফের দেশে মরুভূমি, অনেক অবাক করা বিষয়, কিন্তু এটা আরবের মরুভূমিগুলোর মত এতটা শুষ্ক না। মরূভূমিতে দৌড় ঝাপ শেষে এখন আমাদের গন্তব্য আলাস্কার আরেক শহর স্ক‍্যাগওয়ে।

আলাস্কা গোল্ড রাশের সময় থেকেই এই শহর অনেক জনপ্রিয়। ক্লনডিক হাইওয়ে দিয়েই স্ক‍্যাগওয়ে থেকে ইউকুন এর ডউসন সিটি পর্যন্ত স্বর্ন পরিবহন করা হত। এই রাস্তা এখন ইউকুন থেকে বৃটিশ কলম্বিয়া হয়ে স্ক‍্যাগওয়ে পোর্টে গিয়ে মিশেছে। যারা আলাস্কা ঘুরার জন‍্য জাহাজের ক্রুজ নেয়, তাদের জন‍্য এই স্ক‍্যাগওয়েতে এক থেকে দুই দিনের যাত্রা বিরতি থাকে। যদিও এখনও ট‍্যুরের অনেক দিনের গল্প বাকি কিন্তু নিঃসন্দেহে এই ড্রাইভটাই ছিল আমাদের ট‍্যুরের সবচেয়ে সুন্দর ড্রাইভ। একে একে টেগিস লেক, টুটসী লেকের পাশ দিয়ে ফ্রেজার শহরে এসে পৌছালাম। আর একটু পরেই আলাস্কার বর্ডার। এক ঘন্টার রাস্তা, কিন্তু এত সুন্দর, বারবার থামার জন‍্য প্রায় তিন ঘন্টা চলে গেল। স্ক‍্যাগওয়েতে আমাদের আজকে একটা ট্রেইন ট‍্যুর বুক করা দূপুর একটা থেকে। তার আগেই আমাদের পৌঁছাতে হবে। তারাহুরোর মধ‍্যেই পথের মাঝখানে ইউকুন সাসপেনশন ব্রিজটাতেও কিছুটা সময় কাটালাম । প্রায় ২০০ ফিট লম্বা খরস্রোতা টুটসী নদীর উপর এই ঝুলন্ত ব্রিজ।

কিছুদূর গাড়ি চালানোর পর আমাদের সামনে বহুল প্রতীক্ষিত সেই সাইন “welcome to Alaska” । অফিসিয়ালি আমরা এখন আলাস্কাতে । এখানে ছবি তুলার সুযোগতো আর মিস করা যায় না। একটু পর পরই সবকিছু মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই যে আমাদের একটা ফ‍্যামেলি ছবি তুলে দিবে। আমাদেরকে দেখেই একটা ট‍্যুরিষ্ট গাড়ির চালক থেমে নিজে এগিয়ে এসে ছবি তুলে দিল। এই পুরো রাস্তাই অনেক উঁচুতে পাহাড় কেটে কেটে বানানো। ভয়ন্কর সব বাঁক আর পাশেই বিশাল পাহাড়ের খাদ, মাঝেমধ্যেই মেঘে ঢেকে একফুট দূরেও কিছু দেখা যায় না । হোয়াইট পাস সামিট পার হবার সময় এই রাস্তার উচ্চতা প্রায় তিন হাজার ফুটের কাছাকাছি। যেহেতু কানাডা থেকে ইউএসএ যাচ্ছি, বর্ডারে পাসপোর্ট দেখিয়ে পৌছে গেলাম পোর্ট সিটি স্ক‍্যাগওয়ে। পার্কিং লটে গাড়ি রেখেই দৌড় দিলাম ট্রেইন ট‍্যুর এর স্টেশনে। ওখান থেকেই পোর্টে দাঁড়ানো বিশাল বিশাল ক্রুজ জাহাজগুলো দেখা যাচ্ছে। তিন ঘন্টার এই ট‍্যুরের চারজনের খরচ প্রায় ছয়শত কানাডিয়ান ডলার। কোনভাবে ট্রেইন ছুটে গেলে বাকি ট‍্যুরেও এই শোক কাটিয়ে ওঠা যাবে না। তিন থেকে আট ঘন্টার বিভিন্ন ধরনের ট্যুর প্যাকেজ আছে। আমাদের ট‍্যুরটি হল তিন ঘন্টার “হোয়াইট পাস সামিট” ট‍্যুর। ট্রেন স্টেশনে আসার সাথে সাথেই স্টাফদের দেখানো পথে গিয়ে বগিতে উঠে বসলাম। যেহেতু একপাশে পাহাড় তাই যাবার সময় রেলের বাম পাশের দিকে বসা ভালো, সুন্দর দৃশ‍্যগুলো সব বাম দিকেই পড়বে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এখন খাড়া উপরের দিকে তিন হাজার ফুট উঁচুতে হোয়াইট পাস সামিট পর্যন্ত যাব আমরা। শহর ছাড়ার পরই সিট থেকে উঠে দুই বগির মাঝের খোলা জায়গায় গিয়ে দাড়ালাম। ট্রেন উপরে উঠছে আর রাস্তার পাশের গাছগুলো কমে গিয়ে চারপাশটা আরো খোলামেলা হতে লাগল। যতই উপরে যাচ্ছি তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে, ভালোভাবে জ‍্যাকেট এর চেইন লাগিয়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলাম। তেরশত ফিট উপরে ব্রাইডাল ভিল ফল, তারপর গ্লেসিয়ার স্টেশন (১৮০০ ফিট), দু তিনটা টানেলের ভিতর দিয়ে হোয়াইট পাস সামিটে পৌঁছালাম। ওখান থেকেই ট্রেন ঘুরিয়ে আবার নিচের দিকে নামা শুরূ। এবার তাই ডানদিকের সিটগুলো নিলাম আমরা। উপরে উঠার সময় এড্রনালিন রাশের কারনে ঠান্ডা এতটা অনুভব না হলেও এবার আর বাইরে দাঁড়ানোর সাহস পেলাম না। বগির ভিতরে গরম আবহাওয়ায় বসে এবার গাইডেড ট‍্যুরের বর্ননা শুনা যাক। এত সৌন্দর্য যখন ভাষায় আর লেখা যায় না তখন শুধু এতটুকোই বলব, “It was once in a life time experience”.

ট্রেইন থেকে নামার পর এখন আসল টেনশন শুরূ। সকাল থেকে সারাদিন যত জায়গায় ঘুরেছি গাড়ির ইন্জিন বন্ধ করিনি। কিন্তু ট্রেন ট‍্যুরে যাবার আগে তো আর তা সম্ভব ছিলনা, এখন তাই খোঁজা শুরু করলাম কাউকে পাওয়া যায় কিনা আবার বুষ্ট করার জন‍্য। স্ক‍্যাগওয়েতেও কোন গাড়ির সার্ভিসং শপ নাই। অবশেষে একজন থেকে সাহায্য নিয়ে গাড়ি চালু করলাম। প্রানে আবার পানি ফিরে আসল। আজকে যে কোন ভাবেই হোক “হোয়াইট হর্স” পৌঁছাতে হবে। হোয়াইট হর্স হচ্ছে ইউকুন এর রাজধানী। সন্ধ্যা ৬টার কাছাকাছি সময়, আরও দুশত কিমি বিরতিহীন যাত্রা । চলবে.

#আলাস্কা #রোডট্রিপ

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent