
তাতাইর খুব খারাপ লাগছে আবার ভালোও লাগছে। মামা, মামী কষ্ট পেয়েছে লিমা আপার কথা জেনে। ওরা এতটা আশা করে নাই। এটা ঠিক ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেলে নিজে থেকে শেয়ার না করলে অভিভাবকের পক্ষে তাদের গতিবিধি বোঝা কষ্টকর। একটা মাত্র মেয়ের এমন অধঃপতন ওদের কষ্ট দিচ্ছে। ওরা জানে লিমা স্বাভাবিক না কিন্তু সেটা সরাসরি শুনতে ভালো লাগেনি। কিন্তু চেপে রেখে বিষয়টা খারাপ হচ্ছে এটা বোঝা দরকার। কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। গাড়িতে বসে এসব ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেল উত্তরা।
জয়ের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খোলা। ভিতরে ঢুকে দেখল জয় এক ভদ্রলোকের সাথে কথা বলছে। দুজনের পিঠ দরজার দিকে। তাতাই ভিতরে ঢুকে ওদের পিছনে দাঁড়িয়েছে ওরা টের পাচ্ছে না। গভীর গল্পে নিমগ্ন দুইজন। তাতাই হালকা শব্দ করতে পিছন ফিরে তাকায় দুইজন। জয়ের পাশের লোক লাফিয়ে উঠে ছুটে আসে তাতাইর কাছে।
– আরে তাতাই, অবাক দৃষ্টি!
– সাজিদ ভাই, উচ্ছাসে অবাক তাতাই চিৎকার করে উঠে। তারপরই বলে,
– যাও কথা বলব না।
জড়িয়ে ধরে তাতাইকে সাজিদ,
– সরি সরি সরি, মাই লিটিল সিস্টার।
জয় আরো বিস্ময়ে তাকায় দুজনের দিকে। ও কিছুই বুঝতে পারছে না। এক হাতে তাতাইকে জড়িয়ে নিয়ে সোফায় বসে সাজিদ বলে,
– ও আমার ছোট বোন বুঝেছো জয়।
জয় এবার বলে,
– আর ও আমার ল্যান্ডলর্ড তাতাই।
চোখ গোল করে তাতাই দেখে সাজিদের দিকে।
– ওহ, ল্যান্ডলর্ড অনেক ভারী পদবী, তাই সব ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক, ঠিক আছে থাকো পদবী নিয়ে। আমি কথা বলব না। চলো জয় আমরা বের হই, আজ আমাদের অনেক কাজ।
– সরি বলেছি তো বাবা, আচ্ছা কান ধরছি। সাজিদ সত্যি কান ধরে তাতাইর সামনে দাঁড়ায়।
তারপর বলে,
– মার দে তবু কথা বল, লক্ষী আপু।
সাজিদের ভঙ্গী দেখে হেসে ফেলে তাতাই।
– দেখ কাল মাঝরাতে এলাম এই খানিক আগে ঘুম থেকে উঠে মোটে ভদ্রলোকের সাথে পরিচিত হচ্ছি।
– কোথায় যাওয়া হয়েছিল ?
– দুবাই, বাহরাইন, প্রায় মাসখানেকের সফর ছিল।
গান গেয়ে গোটা পৃথিবীটা ঘুরে বেড়াচ্ছ, খুব মজা তোমার।
– তা এক রকম মজারই জীবন আমার। আসলে তাতাই, জীবনে যদি তুই ভাবিস মজা হচ্ছে তবেই মজা পাবি। নয়তো অনেক পেয়েও শূন্যতাই থেকে যাবে সারাজীবন।
– কথাটা খুব ভালো বলেছো সাজিদ দাদা, তা লন্ডনে আবার আসছো নাকি?
– এখন ঠিক জানি না, আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় যাবার একটা আমন্ত্রণ আছে।
– দেখেছো জয়, গান গেয়ে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে কেমন। জয় হাসে।
– খুব ভালো, খুব সুন্দর।
– জয়ের কিছু কাজ আছে বাংলাদেশে, বলেছে কিছু? তাতাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সাজিদের দিকে।
– না, এখনো কিছু শোনো হয়নি।
– ওহ, তুমি কি করবে এখন?
– তোদের সাথে আড্ডা দিতে পারি, তোরা কি কোথাও যাচ্ছিস?
– জয় যে কাজে এসেছে তার খোঁজে যাব ভাবছি।
– আপত্তি না থাকলে আমি যেতে পারি তোদের সাথে।
জয় বলে,
– ভালো হবে, যদি যাও আমাদের সাথে। আমরা দুজনই নতুন এই দেশে, আমার কথাগুলো তোমার শোনা দরকার, তবে আজ তুমি খুব বেশি ক্লান্ত কি ?
– কী যে বলো না জয়, সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে আমার বোন তাতাইকে দেখে।
উচ্চস্বরে হাসে সাজিদ, হেসে ফেলে জয়ও, তাতাই বলে,
– তাহলে চলো বেরিয়ে পড়ি। যেতে যেতে সব বলব তোমাকে।
প্রথমে যায় ওরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। ভিড়ের রাস্তায় উত্তরা থেকে পৌঁছাতে প্রায় দুটো বেজে যায়।
নানান বিষয়ে গল্প করতে করতে জয়ের বিষয়ে কিছু বলা হয়ে উঠে না। সাজিদ খানিক অবাক হয়। বিদেশ থেকে আসা দুজন মানুষের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাওয়া দেখে।
দেশে থেকে ওর কখনো এখানে আসা হয় নাই। ঘুরে ঘুরে দেখতে আনমনা হয়ে যায় মন। যুদ্ধ সময়ের সব স্মৃতি সাজান। একটা রক্তমাখা ফ্রক ছোট্ট মেয়ের, কাঁচের ফ্রেমে বাঁধান। মুক্তিযোদ্ধা বাবা মেয়ের এই স্মৃতি কাঁচে বাঁধিয়ে দিয়ে গেছে ইতিহাসের সংরক্ষণ কেন্দ্রে। মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে না পেয়ে তার কয়েক মাসের মেয়েটিকে বুটের নিচে পিষে মেরেছিল পাকসেনারা। নৃশংসতার এমনি সব স্মৃতি ঘরের দেয়ালজুড়ে। এসব দেখতে দেখতে সাজিদের অন্ধকার, আগুন শব্দ মনে হতে থাকে। ও বাইরে এসে সিঁড়িতে বসে থাকে।
তাতাই ও জয় ঘুরে ঘুরে দেখে সব। স্মৃতিবিজড়িত জিনিসগুলো ওদের মনে কষ্ট আর কান্নার সঞ্চার করে। বুকের ভিতর ব্যথার ভার নিয়ে ওরা সাজিদকে খুঁজে, বাইরে এসে দেখে ও চুপচাপ সিঁড়ির উপর বসে আছে, মুখ গম্ভীর। তাতাই সাজিদের পাশে বসে, নিচুস্বরে বলে,
– কি ব্যাপার সাজিদ ভাই?
– মন খারাপ হয়ে গেল ?
– আমাদেরও খুব খারাপ লাগছে।
– তাতাই শোন, একটা কথা কখনো কাউকে বলিনি, তোদের কি বলব আজ?
– শুনব সাজিদ ভাই, তবে এখান থেকে উঠো, লোকজন আসা-যাওয়া করছে, চলো কোথাও খোলা জায়গায় বসি।
ওরা রমনা রেস্তোরাঁর লেকের উপরের খোলা বারান্দায় যেয়ে বসে। কোনো ভূমিকা ছাড়া হুট করে সাজিদ বলে,
মাঝে মাঝে একটা স্মৃতি আমাকে খুব তাড়িয়ে বেড়ায়। ভাবি কোনো স্বপ্ন কিন্তু স্বপ্ন নয় আসলে একটা ঘটনা। ঠিক কোনো সময়ের মনে পড়ে না। মাঝে মাঝে ভুলে যাই জীবনযাপনের ব্যস্ততায় কিন্তু ঠিক আবার এসে হানা দেয় ।
কি সাজিদ ভাই, তাতাই আগ্রহভরে জানতে চায়। জয়ও তাকিয়ে আছে জিজ্ঞাসু চোখে।
পান পাতা মুখের এক নারী, একটা লোক বুনো গন্ধওয়ালা, লোমশ বুক ছোট একটা বাচ্চাকে উপরে ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছে বাতাসে আবার ধরে ফেলছে। বাচ্চাটা হাসছে খিলখিল।
বাহ সুন্দর তো।
মনে হয় সেই বাচ্চাটা আমি জানো।
তাতাইর চট করে মনে পড়ে লিমা আপা বলছিল, সাজিদ আমার ভাই না, ওকে আমার বাবা কুড়িয়ে এনেছিল।
এমন কেন মনে হয়? জয় বলে।
আবার মনে হয় অনেক আগুন, অন্ধকার, প্রচণ্ড শব্দ। সাজিদ যেন ঘোরের ভিতর কথা বলছে, জয়ের প্রশ্ন শুনে নাই।
মাথার চুলে হাত চালাতে চালাতে কেমন এক হাসি ফুটে উঠে সাজিদের মুখে।
তোমরা জান আমি গান করি, আমার অনেক ভক্ত। পত্রপত্রিকা থেকে ইন্টারভিউ নিতে আসে, ওদের একটা কমন প্রশ্ন থাকে আমার জন্মদিন কবে? যার উত্তর আমি দিতে পারি না। আমি জানি না আমার জন্মদিন কবে।
তোমার মা বাবা বলেনি তোমাকে ? জয় বলে। ম্লান হেসে সাজিদ বলে,
আমার মা বাবাকে আমি কখনো দেখিনি জয়, আমার স্বপ্নের ভিতর, আমার ঘোরের ভিতর যে পানপাতা মুখের নারীকে আমি দেখি মনে হয় সে আমার মা। যে লোকটা বাচ্চাটাকে লুফালুফি করে খেলে মনে হয় সেই আমার বাবা।
তুমি তাদের ব্যাপারে কিছুই জান না সাজিদ ভাই?
নারে আপু কিচ্ছু জানি না। কিচ্ছু মনে নাই। তোমার মামা আবেদিন আহমেদ উনি আমাকে নিয়ে আসেন তার বাসায়, তখন আমি চৌদ্দ-পনের বয়েসের হয়তো।
তার আগে কোথায় ছিলে ?
বাদশা মিয়া নামের এক লোকের কাছে।
চলো তাহলে তার কাছে যাই সে বলতে পারবে। তাতাই উৎসাহে দাঁড়িয়ে যায়। তাতাইর হাত ধরে ওকে বসিয়ে দেয় সাজিদ─
সেও জানে না তাতাই।
কেন?
শুধু বলত নিজের পোলা মনে করে তোরে তুইলা আনলাম।
মানে ?
সেই যুদ্ধ জয়, যুদ্ধের সময় বাদশা মিয়া আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছে।
নিঃশব্দ বসে থাকে তিনজন অনেকক্ষণ। স্থির জলে গাছগাছালির ছায়া।
বিকালের হেলে পড়া রোদের আলোয় গাছের লম্বা ছায়া দুলছে সবুজ ঘাসে। হালকা মেঘের গায়ে গোধূলির রঙ গাঢ় হচ্ছে ধীরে ধীরে। একসময় জয় বলে,
যুদ্ধের কারণেই আমার বাংলাদেশে আসা সাজিদ।
বুঝতে না পেরে চোখ কুচকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় সাজিদ জয়ের দিকে।
সে আরেক করুণ কাহিনী সাজিদ ভাই, তাতাই বলে।
জয় বলে যায় ওর জীবনের গল্প সাজিদের কাছে। নিঃশব্দে শুনে সাজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আরো কত কাহিনী কোথায় লুকিয়ে আছে কে জানে। উঠে জয়কে বুকে জড়িয়ে রাখে সাজিদ।
বেরিয়ে যাওয়ার আগে লিমাকে প্রমিজ করিয়ে গেছে তাতাই সে আজ বাইরে বেরুতে পারবে না। সন্ধ্যায় তাতাই বন্ধু নিয়ে আসবে লিমাকে অবশ্যই থাকতে হবে। তাতাইর বন্ধুর সাথে পরিচিত হতে খুব আগ্রহ না হলেও শেষ পর্যন্ত তাতাইকে খুশি করার জন্য রাজি হয়েছে লিমা বাসায় থাকবে বলে। তবে নটা দশটার পর ও আর থাকবে না। ওকে একবার বাইরে যেতেই হবে। এত রাতে কেন যেতে হবে ? একদিন না গেলে হয় না। তাতাইর এসব কথার জবাব দেয় নাই লিমা, শুধু বলেছে ওকে যেতেই হবে। তাতাই জানে কেন যেতে হবে লিমাকে। তাই সে আর জোর করে নাই। থাকতে রাজি হয়েছে কিছু সময় এই অনেক।
সন্ধ্যায় জয় আর সাজিদসহ বাড়ি ফিরে তাতাই। মামা মামী উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়ে বসার ঘরে নিয়ে যান ওদের। সাজিদ বহু বছর পর এই বাড়িতে এলো। আবেদিন আহমেদ বুকে জড়িয়ে ধরলেন ওকে। তাতাই উচ্ছ¡সিত হয়ে বলে,
– মামা জানো, জয় যে বাড়িতে উঠেছে সেটা সাজিদ ভাইয়ের বাড়ি।
– তাই নাকি ?
– ও দেশে ছিল না তাই জানতাম না এতদিন, কাল রাতে ফিরেছে।
– আমার সাথে যা রাগ করেছিল তাতাই, সাজিদ বলে
– এখন সব ঠিকঠাক জয় বলে,
– তোমরা আজ কি কি করলে ?
– সে অনেক কথা মামা পরে বলব। আমি ভিতর থেকে আসছি। তাতাই লিমার ঘরে যায়। লিমা তাতাইকে দেখে বলে,
– এটা তুই ঠিক করসনি তাতাই, আমি থাকছি না, বাইরে চলে যাচ্ছি।
– না থাকলে আর কি করব, আমার বন্ধু তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল আর আমি কিন্তু সত্যি জানতাম না সাজিদ ভায়ের বাসায় আছে জয়।
– এসব কথা আমি শুনতে চাই না তাতাই।
– একবার শুধু দেখা করে যাও।
– না।
– সাজিদ ভাইকে তুমি খুব ভালোবাস, সেও তোমাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু কোথাও একটা গ্যাপ আছে। সেটা কথা বলে ঠিক করা যায় না লিমা আপা ? আচ্ছা থাক বাসায় যখন আছো একটু দেখা করো ওদের সাথে, খাও আমাদের সাথে। লিমা আপা তুমি যে আমাকে মুখে তুলে খাওয়াতে, সাজাতে সেগুলো আমি খুব মিস করছি। তাতাই অনেক কথা বলে যায় আপন মনে আর লিমার মুখের উপর নজর রাখে।
লিমা রাগে কটমট করছিল সে ভাবটা একটু নমনীয় মনে হয়। বলে,
– আমাকে কেমন দেখাচ্ছে ?
– তুমি বরাবরের মতন সুন্দর। তবে একটু রোগা হয়েছো এবার। অবশ্য রোগা না বলে স্লিম বললে শুনতে ভালোলাগে।
– যাহ ফাজিল, এই প্রথম লিমার মুখে সত্যিকারের হাসি দেখল তাতাই।
লিমাকে সাথে নিয়ে বসার ঘরে আসে তাতাই। সোজা জয়ের কাছে এগিয়ে যায়,
– এই যে জয় দেখো আমার প্রিয় বোন।
জয় উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
– সি ইজ সো প্রিটি। শুনেছি তুমি খুব ভালো গান করো। আমার কি শোনার সৌভাগ্য হবে ? লিমা মিষ্টি হেসে বলে,
– অনেক দিন আমি গান করি না।
– তাতে অসুবিধা নেই, আমি ভুলগুলো শুধরে শুনব। হেসে ফেলে সবাই জয়ের কথায়।
মামা মামী দুজনেই অবাক হয়েছেন বেশ লিমার ব্যবহারে আর খুশি হচ্ছেন তাতাইর ওপর।
সাজিদ এগিয়ে এসে বলে,
– কেমন আছিস লিমা, আমরা আবার একসাথে গান করব। লিমা মুখ নিচু করে থাকে, কিছুই বলে না।
– শোন, তোমাদের একটা খবর দেই। আবেদিন আহমেদের কথায় সবাই উনার দিকে মনোযোগ দেয়।
আগামী পরশু আমরা সবাই একসাথে গ্রামের বাড়ি যাবো। সাজিদ এসে গেছো, খুব ভালো হয়েছে। না হলে তোমাকে আবার খুঁজতে হতো
– কেন ?
– গান করতে হবে। দেশের গান, ষোল ডিসেম্বর উপলক্ষে।
– মামা তুমি না সকালে বলেছিলে, তুমি সব কাজ থেকে ছুটি নিয়েছো আমাকে সময় দিবে এই ক’দিন ? তাতাই ঠোঁট উল্টিয়ে অভিযোগ করে।
– এই সময়ের মাঝে কিছু কাজ করতে হবে মা, এসে গেল কাজটা ফেলে রাখা যাবে না তাই আমিও পরিকল্পনা করে ফেললাম যে গ্রামের বাড়িতে কাজটা করব।
– সব সময় কাজ, বেড়াতে যাওয়ার সাথে আবার কি কাজ নিয়ে যাচ্ছো বলতো,
মিসেস আহমেদ, জানতে চান।
– সকালে যে টেলিফোনটা এলো তাতাইর সাথে কথা বলছিলাম যখন, তাতাইর মনে পড়ে ফোন বাজলে মামা উঠে গেলেন ফোন ধরতে আর ও চলে গেল লিমা আপার ঘরে।
– বুঝলাম, তা কে এমন জরুরি ফোন করল যে কাজ দিয়ে দিল তোমার বন্ধের সময় ?
– আসলে কাজটা আমারই।
– আসল কথাটা বলতো বাবা ছটফট করে লিমা,ধৈর্য না রাখতে পেরে জোরেই বলে ফেলে। মেয়ের কথা শুনে হাসেন আবেদিন আহমেদ।
– বলছিরে মা, মিসেস সামিয়া ইকবাল প্রখ্যাত লেখিকা, আমার টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত অনুষ্ঠান করেন। উনার অনুষ্ঠানগুলো খুব অর্থবহ আর গুরুত্বপূর্ণ। এবার বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব উনাকে দিয়েছিলাম। উনি অন্য রকম একটা উপস্থাপনা করতে চান বললেন। তাই আমি যদি রেকর্ডিংয়ের সময় থাকি তবে উনি স্বস্তি পাবেন। উনি অনুষ্ঠানে কোনো কাটছাট রাখতে চান না। উনার অনুষ্ঠানের ধরন শুনে আমার মনে হলো স্টুডিওর চেয়ে গ্রামের বাড়িতে এই অনুষ্ঠানটা ধারণ করলে আরো ভালো হবে। তাই উনি আর দু-তিনজন আমাদের সাথে ওখানে যাবেন।
– গ্রেট আইডিয়া মামা, আমার খুব ভালো লাগছে। তাতাই হাততালি দিয়ে প্রশংসা করে। সাজিদ বলে,
– ভালো হবে।
– এই লিমাপা তুমি গান করবে কিন্তু।
– নাহ আমি না।
– না বললে হবে না। জয়কেও আমরা দাঁড় করিয়ে দিব গান করতে সাজিদ ভাইর সাথে, কেমন হবে মামা? লিমা হেসে উঠে কিন্তু আবেদিন আহমেদ বলেন,
– গুড আইডিয়া।
– মামী খেতে দাও আমার অনেক ক্ষিদা লেগেছে।
– খাবার টেবিল রেডি, এখানে তো কথাই শেষ হচ্ছে না।
– চলো চলো চলো।
সবাই খাবার টেবিলে গিয়ে বসে। খাবার প্রশংসা আর পরিচিতি চলছে জয়ের কাছে। বহুদিন বাদে এক হাসিখুশি সন্ধ্যা এসেছে এ বাড়িতে।
তাতাই বলে।
– এই সুন্দর খাবার-দাবারের মাঝে আমি একটা ঘোষণা দিতে চাই।
– আবার কি, মামী জানতে চান।
– আমি যখন ছোটবেলায় আসতাম নানু আমাকে কোলে বসিয়ে আদর করতেন আর বলতেন, বুবু বড় হয়ে শিক্ষিত হয়ে, যদি পার এদেশের গরিব মেয়েদের জন্য কিছু করো। নানুর সে কথা আমার প্রায়ই মনে হয়, আমি চাইলে কিছু করতে পারি। আমার সে শিক্ষা এবং অবস্থা আছে। আমি এদেশে মেয়েদের জন্য কিছু একটা করতে চাই তবে তোমাদের আমাকে সাহায্য করতে হবে।
তাতাইর কথা শুনে অসম্ভব ভালোলাগে সবার। মামা উঠে এসে আদর করে কপালে চুমু দেন তাতাইকে।
– তোকে সব সহযোগিতা আমি দিব মা।
মিসেস আহমেদ মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখেন, লিমা খানিকটা ধাক্কা খায় তাতাইর কথাবার্তায়।
সাজিদ আর জয় খুব প্রশংসা করে তাতাইর এতটুকু বয়সে এমন চিন্তা-ভাবনার। জয় জানায়,
– ও আমাকে প্লেনে বলেছিল, কিছু একটা পরিকল্পনা নিয়ে আসছে এবার বাংলাদেশে।
প্রশংসনীয় সব কথাবার্তা শুনতে শুনতে তাতাই আবার বলে শোন শোন,
– আমার পরিকল্পনাটা বাস্তবায়িত হলে আমি কিন্তু এদেশে থেকে যাব, মাকে যেন কেউ কথাটা এখনি বলে দিও না।
টরন্টো, কানাডা
