
কিছুদিন আগ পর্যন্ত পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতাকে ভিত্তি করে কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পরিমাপ করা হতো। সেই সনাতনী ধারণা থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতি অনেকদূর সরে এসেছে। এখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের জ্ঞান এবং সৃজনশীলতার উপর নির্ভর হয়ে পড়ছে। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ যা কাঁচা মালের যোগান দেয় এবং বৃহদাকার কলকারখানা যেখানে উৎপাদিত হয় হাজার কোটি পণ্যসামগ্রী। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিমাপক এবং চালিকা শক্তির ধারণা পাল্টে যেতে শুরু করলো।
কর্মীদের সৃষ্টিশীলতা এবং উদ্ভাবণী ক্ষমতার প্রয়োগ করে গুগল, মাইক্রোসফট্ এবং অ্যাপলের মতো কোম্পানিগুলো হয়ে উঠলো পুঁজিবাদী মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রতীক।
সম্প্রতি কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রথম্যান স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক তাঁর দুইজন সহযোগী নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গবেষণার প্রতিপাদ্য ছিল ‘সৃষ্টিশীলতাই আধুনিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি’। প্রযুক্তি, প্রতিভা এবং পরমতসহিষ্ণুতা Ñ এই তিন ‘প’কে আবর্তিত করে পরিচালিত হবে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ফ্লোরিডা বলেন ‘সৃষ্টিশীল পুঁজিবাদ’ নিয়ন্ত্রণ করবে একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি। এই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির গতিধারাকে নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষের প্রতিভা এবং উদ্ভাবণীক্ষমতা।
এখন প্রশ্ন হল কিভাবে সম্ভব হবে প্রযু্িক্ত, প্রতিভা এবং পরমত সহিষ্ণুতার (ট্যাকনোলজি, ট্যালেন্ট এবং টলারেন্স) সম্মিলন কিংবা অধিগ্রহণ। সনাতনী অর্থনীতিবিদগণ বলেন যে ভূমি, কর্মী, পুঁজি এবং প্রতিষ্ঠান এই চারের সম্মিলনে ঘটে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যে দেশের শ্রমিকের মজুরী কম, ভূমি সহজলভ্য, পণ্য আদান প্রদানের অবকাঠামো রয়েছে, সে দেশে ধাবিত হবে পুঁজি এবং প্রতিষ্ঠান। আমরা দেখেছি চীন এই শর্তগুলো পূরণ করে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্রভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি যে এই সমীকরণে চলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকে প্রধানত কর্মীর কম মজুরীর এবং ভূমির সহজলভ্যতার কারণে বিশ্বের অনেক নামীদামী ব্রান্ডের পণ্যের কারখানা চীন, ভারত, ব্রাজিল, ভিয়েতনামসহ প্রভৃতি দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় গড়ে উঠেছে জ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবণীক্ষমতা সম্পন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান; যেমন- গুগল, আমাজন, ফেসবুক ইত্যাদি। ফলে উন্নত অর্থনীতির দেশে কর্মীদের শ্রেণিবিন্যাসে এসেছে পরিবর্তন। আগে ছিল মূলত মালিক শ্রেণি, কারণীক শ্রেণি এবং শ্রমিক শ্রেণি। আগে শ্রমিক ছিল মোট জনশক্তির অর্ধেক। কলকারখানা স্থানান্তরের পর এখন তা কমে এসেছে এক পঞ্চমাংশে। অন্যদিকে শ্রমবাজারে বিস্তার লাভ করেছে সৃষ্টিশীল কর্মী এবং সেবাপ্রদান কর্মী। বর্তমানে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ হল সৃজনশীল কর্মী। প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসার পরিচালক, ব্যবস্থাপক, শিল্পী, সাহিত্যিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী শ্রেণিকে বলা হচ্ছে সৃজনশীল শ্রেণি। অন্যদিকে যারা দোকানে, রেস্তোরায়, হোটেলে, ব্যাংকে, হাসপাতালে গ্রাহকদের সরাসরি সেবা প্রদান করছে এবং রুটিনধর্মী কাজ করছে তাদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে সেবা প্রদানকর্মীর শ্রেণিতে। এই সৃজনশীল শ্রেণি যেহেতু অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক, তাই তাদের আয় সেবাকর্মীদের থেকে অনেক বেশি। উন্নয়নশীল দেশে যেমন মালিক এবং শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আয় বৈষম্য তেমনি উন্নত বিশ্বে সেই বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় সৃজনশীল এবং সেবাকর্মীদের মধ্যে।
উন্নত বিশ্বে উৎপাদনখাতের সংকোচনের ফলে একদিকে কমে এসেছে কায়িক শ্রমিক শ্রেণির সংখ্যা অন্যদিকে বিস্তার লাভ করেছে সেবাখাত। বর্তমানে সেবাখাতে কর্মীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তি এখন অর্থনৈতিক প্রগতির চালিকাশক্তি। প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে সম্পদ এবং বিস্তারলাভ করছে পুঁজিবাদী অর্থনীতি। কার্ল মাক্স এবং পরবর্তীতে জোসেফ সুম্পিটার বলে গেছেন যে, প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে গড়ে উঠবে শিল্প। পঞ্চাশের দশকে প্রখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্টো সলো প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক প্রগতির কেন্দ্র হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছি কিভাবে প্রসার লাভ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির তথ্য প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠানসমূহ।
প্রতিভাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে আরেকটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে। পঞ্চাশের দশকে প্রখ্যাত ব্যবস্থাপনা পরামর্শক এবং লেখক পিটার ড্রাকার জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক বিকাশের কথা বলে গেছেন। তিনি মানবকে সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন যে মানুষের জ্ঞান এবং প্রতিভা হবে আগামী বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিয়ামক। পরবর্তীতে পল রোমার তার বিখ্যাত ‘থিওরি অব ইকনোমিক গ্রোথ’ গ্রন্থে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিকাশের ধারাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
এখন প্রশ্ন হল প্রযুক্তি এবং প্রতিভা এই দুই চালিকাশক্তির কিভাবে সমন্বয় ঘটানো সম্ভব? প্রতিভা কোনো একটি বিশেষ জাতি, ধর্ম বা বর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সারাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে মেধাবান এবং প্রতিভাবান মানুষ। আধুনিক বিশ্বে সেইসব দেশ এগিয়ে যাবে যারা এই সৃজনশীল প্রতিভাবানদের আকৃষ্ট করতে পারবে। সৃজনশীল মানুষেরা স্বাধীনচেতা এবং তারা মুক্তচিন্তার পরিবেশ পছন্দ করে।
এক গবেষণায় দেখা যায় যে, ডাইভারসিটি বা বহুমাত্রিকতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক। যেসব দেশের পরিবেশ নতুন ধারণাকে ধারণ করতে সক্ষম সেইসব দেশে ভিড় করেছে সৃজনশীল মানুষ। রিচার্ড ফ্লোরিডার গবেষণাপত্রে দুই ধরনের পরমত সহিষ্ণুতার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত যেসব দেশে প্রকৃতপক্ষে জাতি, ধর্ম এবং বর্ণের মধ্যে বিভেদ কম এবং সংখ্যা লঘিষ্টরা নিরাপদ বোধ করে সেসব দেশে প্রতিভাবানদের আগমণ ঘটেছে। দ্বিতীয়ত যেসব দেশে মানুষের একান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয় না সেসব দেশে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে সৃজনশীল এবং প্রতিভাবান মানুষেরা। এই দুই ধরনের পরম সহিষ্ণুতার সমীক্ষার বিচারে এগিয়ে আছে কানাডা, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। অপরপক্ষে পরমতসহিষ্ণুতার পরিমাপকে পিছিয়ে আছে ব্রিক দেশসমূহ; যেমন- চীন, রাশিয়া, ভারত এবং ব্রাজিল।
প্রযুক্তির প্রায়োগিক পরিমাপকে দুইটি বিষয়কে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রথমটি হল কোনো দেশের জিডিপির কত অংশ ব্যয় করা হয় শিক্ষা এবং গবেষণায়। দ্বিতীয়টি হল পারক্যাপিটা পেটেন্টের সংখ্যা।
প্রযুক্তির পরিমাপক বিবেচনায় এগিয়ে আছে ইসরাইল, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইডেন, জাপান, ডেনমার্ক, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া। ব্রিকস দেশসমূহের মধ্যে চীন অবশ্য এই ক্ষেত্রে ১৪তম স্থান নিয়ে এগিয়ে আছে। অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে আছে রাশিয়া, ব্রাজিল এবং ভারত।
প্রযু্িক্ত, প্রতিভা এবং পরমতসহিষ্ণুতা এই তিনটি বিষয়কে যুক্ত করে রিচার্ড ফ্লোরিডা একটি গ্লোবাল সৃজনশীল সূচক (ইনডেক্স) তৈরি করেন। এই সূচকের বিবেচনায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে অস্ট্রেলিয়া। এছাড়াও প্রথম সারিতে স্থান করে নিয়েছে সুইডেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং নেদারল্যান্ড। আর ব্রিক দেশসমূহের রেংকিং হলো- ব্রাজিল ২৯তম, রাশিয়া ৩৮তম এবং ভারত ৯৯তম।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, সৃজনশীল সূচকের সাথে জিডিপি পার ক্যাপিটার একটি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ যেসব দেশের জিডিপি পার ক্যাপিটা বেশি সেইসব দেশ প্রযুক্তি, প্রতিভা এবং পরম সহিষ্ণুতার সূচকে এগিয়ে আছে।
তবে সনাতনী শ্রমশিল্প মডেলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যদি তুলনা করা হয় সেক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। যেমন প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশসমূহ সৃজনশীল সূচকে পিছিয়ে থাকলেও জিডিপি পার ক্যাপিটার দিক থেকে এগিয়ে আছে। কাতার, কুয়েত, ইরাক, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে তেল উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে। সঙ্গত কারণেই সৃজনশীল সূচকের সাথে এই সবদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনো সংযোগ নেই। তবে তেল উৎপাদন একসময় ফুরিয়ে এলে আবার সংকট তৈরি হতে পারে। এই জন্য অর্থনীতির বুনিয়াদকে শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রযু্িক্ত, প্রতিভা এবং পরমতসহিষ্ণুতা এই তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতেই হবে নতুবা অর্থনীতির চাকা শ্লথ হয়ে পড়িবে।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যেসব সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ নিতে চলেছেন তাতে সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুকে এক কলামে লেখেন, “আমার প্রপিতামহ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং পোল্যান্ড থেকে। প্রিসিলার (তার স্ত্রীর) বাবা মা এসেছেন চীন ও ভিয়েতনাম থেকে। যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের দেশ। এ নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক নির্বাহী আদেশের প্রভাব নিয়ে সবার মতো আমিও উদ্বিগ্ন।” বিভেদনীতির এই অভিবাসন বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছে গুগল। এক স্মারকলিপিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই বলেন, এই নীতি সৃষ্টিশীল কর্মীদের এবং তাদের পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে যা আমাদের জন্য পীড়াদায়ক। তিনি বলেন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রে মেধাবীদের আগমণে বাধা সৃষ্টি করবে এবং প্রযুক্তিখাতে যা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। উল্লেখ্য সিলিকন ভ্যালির দুই তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নাগরিক। ফ্লোরিডা তার বিখ্যাত বই ‘দ্য রাইজ অব ক্রিয়েটিভ ক্লাস’-এ বলেছেন, মানুষের সৃষ্টিশীলতাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। আজকের অর্থনীতিতে উন্নত দেশগুলো এগিয়ে আছে নিয়ত সৃষ্টিশীলতার উপর ভিত্তি করে। প্রযুক্তি, সম্পদ, বিত্ত-বৈভব এসব সৃষ্টিশীলতার ফলশ্রুতি।
কিন্তু বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে যেভাবে সংরক্ষণবাদী এবং বিভেদনীতি প্রাধান্য লাভ করছে তাতে ভেতর থেকে ভাঙ্গনের আশংকা জাগে। ঘুনে ধরা অর্থনীতির পতন আগে আন্দাজ করা যায় না।
