ভাষাশহিদ রফিকের মেধাবী উত্তরসুরী অদ্বিতীয় দ্বিতীয় রফিক

একজন রফিকুল ইসলাম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিশেবে প্রতিষ্ঠার জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৫২ সালে

একজন রফিকুল ইসলাম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিশেবে প্রতিষ্ঠার জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৫২ সালে। একজন রফিকের রক্তের গৌরবে অভিষিক্ত আমাদের বর্ণমালা। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঘটেছিলো ভাষার জন্যে জীবন দেয়ার অবিস্মরণীয় অনন্য সেই ঘটনাটি। একুশে ফেব্রুয়ারি দিবসটি বাঙালি উদযাপন করে শোক মমতা প্রতিবাদ প্রতিরোধ আর উদ্দীপনার মহান অনুষঙ্গ হিশেবে।

বায়ান্নর ভাষাশহিদ সালাম-বরকত-জব্বার-শফিউর-রফিকের উত্তরসুরী আরেকজন রফিক ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং সাফল্যের দীর্ঘ বছর পর আমাদের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিশেবে প্রতিষ্ঠার জন্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন আরেকটি লড়াইয়ে। এই দ্বিতীয় রফিকের লড়াইটিও সাফল্য অর্জন করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন কেবলমাত্র বাঙালির গৌরব আর অহংকারের দিবস নয়। ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

- Advertisement -

অদ্বিতীয় এই দ্বিতীয় রফিক অর্থাৎ রফিকুল ইসলাম বসবাস করেন কানাডার ভ্যাংকুভারে। আমি থাকি অটোয়ায়। অটোয়া থেকে ভ্যাংকুভারের দূরত্ব কতোটুকু? কিলোমিটারের হিশেবে না গিয়ে ঘড়ির টাইমিং-এর হিশেবটাই বলি। আমার শহর অটোয়ায় যখন রাত বারোটা, রফিকুল ইসলামের ভ্যাংকুভারের ঘড়িতে তখন রাত ন’টা। সুতরাং আমাদের দুজনার দেখা সাক্ষাতের সুযোগ কম। কথাবার্তা যা হয় টেলিফোনেই। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই রফিকুল ইসলামের সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছে সামনাসামনি, এবং সেটা ঢাকায়। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তির পর পর ১৯৯৯ সালে তিনি গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। বিপুল সম্মানে ভূষিত হচ্ছিলেন তিনি সর্বত্র। তখন এক বিকেলে এসেছিলেন তিনি বাংলা একাডেমীতে। আমি তখন বাংলা একাডেমীর নির্বাচিত কাউন্সিলর। বাংলা একাডেমী তাঁকে খুব সম্মান প্রদর্শন করেছিলো। তারপর আমি একসময় অনাবাসী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হলাম। পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে থিতু হলাম কানাডায়। কানাডায় আসার কয়েক বছর পর এক বিকেলে অচেনা এক নাম্বার থেকে কল এলো আমার টেলিফোনে। অপর প্রান্তে ঐতিহাসিক রফিকুল ইসলাম। তাঁর বাংলাদেশ সফরকালীন স্টিল ফটোগ্রাফি অথবা ভিডিওতে তিনি আবিস্কার করেছেন বাংলা একাডেমীতে তাঁর পাশের চেয়ারেই ছিলো এক নগন্য ছড়াকার। আর সেই ছড়াকার বসবাস করেন তাঁরই সেকেণ্ড হোম কানাডায়! তিনিই উদ্যোগী হয়ে আমার ফোন নাম্বার যোগাড় করেছেন। দু’চারদিন কথা বলার পর আবার আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। অতিসম্প্রতি ফেসবুকে কবিবন্ধু দুলালের একটা লিংকের সূত্র ধরে ইত্তেফাক খুলে দেখি প্রিয় রফিকুল ইসলাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন! মরণব্যাধী ক্যান্সার তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে দ্রুত। মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠলো।

দুলালের কাছ থেকে তাঁর খবর শুনি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। আমি টেলিফোন করলাম। খুবই খুশি হলেন তিনি। এরপর আমাদের টেলিফোনালাপ চলতে থাকে নিয়মিত। অনেক পরিকল্পনা করি আমরা। চ্যানেল আইতে একটা সিরিয়াস প্রোগ্রাম বিষয়ে আমরা ব্যাপক আলোচনা করি। বইমেলার সময় আমি বাংলাদেশে যাবো। ওই সময়টায় তিনিও যাবেন বাংলাদেশে। সুতরাং রফিকুল ইসলামকে নিয়ে, তাঁর স্বপ্ন নিয়ে, তাঁর চিন্তা ও পরিকল্পনাগুলো নিয়ে দীর্ঘ একটা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নানান রকম ছক কষি আমরা। এরই ধারাবাহিকতায় গেলো সপ্তাহে রফিকুল ইসলামকে ফোন করে ভয়েস মেইলে মেসেজ রাখি। একদিন দুদিন তিনদিন করে করে সপ্তাহ পেরিয়ে যায় কিন্তু তিনি কল ব্যাক করেন না। আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি। আবার কি অসুস্থ হয়ে পড়লেন রফিক ভাই?

আমার অনুমান সঠিক ছিলো। সুস্থতার সামান্য লক্ষণ দেখিয়ে মরণব্যাধী ক্যান্সার এইবার তাঁকে বেঁধে ফেলেছে আষ্টেপৃষ্ঠে। আর বুঝি রক্ষা নেই। বিপুল প্রাণশক্তির অধিকারী রফিক ভাই গতকাল রাতে ফোন করেছিলেন হাসপাতাল থেকে। তাঁর কণ্ঠে অতীতের উচ্ছ্বাস আবেগ সবকিছু যথাযথভাবে প্রবহমান থাক সত্ত্বেও কোথায় যেনো বা কিছুটা তাড়া অনুভব করলো আমার শ্রবণ ইন্দ্রীয়। রফিক ভাই বললেন, ‘আওয়ার ল্যাঙুয়েজ আওয়ার ওয়ার্ল্ড’ বিষয়ে আপনার সঙ্গে করা আমাদের পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন বুঝিবা করে যেতে পারবো না। আমি বললাম, আমার মন খারাপ করে দেবেন না রফিক ভাই। তিনি বললেন, মন খারাপ করবেন না রিটন ভাই। জীবন অনেক সুন্দর। সেই সুন্দর জীবনটা উপভোগ করুন। আর যদি কথা না হয় আর যদি দেখা না হয়—বিদায় বন্ধু…

আমি আর্তনাদ করে উঠলাম—রফিক ভাই প্লিজ, এখনি বিদায় বলবেন না। আপনি আমাদের কতো বড় সম্মান আর গৌরব এনে দিয়েছেন! আপনার কাছ থেকে আমাদের আরো অনেক কিছু পাওয়ার বাকি আছে…

প্রবল প্রাণশক্তিতে ভরপুর রফিক ভাইয়ের কণ্ঠে ফের বেজে ওঠে কী রকম অদ্ভুত একটা বেদনার ভায়োলিন—আমার জন্যে একটুও মন খারাপ করবেন না ভাই আমার। বিদায় বন্ধু…

প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় রফিক ভাই, গতকাল রাতে টেলিফোনে আপনার এইরকম বিদায় নেয়ার পর কী যে হয়েছে আমার! চোখ দুটি বারবার কেমন ঝাপসা হয়ে উঠছে। আপনি আমাকে এভাবে কাঁদালেন কেনো? হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর আপনার সঙ্গে আমার কঠিন ঝগড়া হবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী আলীম নামের রাজাকারটা বেঁচে থাকবে এবং আলীমের আব্বা ঘাতক গোলাম আযমও বেঁচে থাকবে এই পৃথিবীতে আর আপনি চলে যাবেন! প্রকৃতির এ কেমন নিষ্ঠুরতা!

- Advertisement -

Read More

Recent