চক্কর

যারা থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন বা দেখতে ভালোবাসেনতাদের জন্যে পারফেক্ট একটা ছবি

এ ঈদের বাকি সব ছবি আর এ ছবির মাঝে বিস্তর তফাত। কেন?

এটা আপাদমস্তক থ্রিলার ছবি।

- Advertisement -

যারা থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন বা দেখতে ভালোবাসেন,তাদের জন্যে পারফেক্ট একটা ছবি। আর আমি একটু আধটু থ্রিলার লেখার চেষ্টা করি বলে আমার জন্যে পোয়া বারো।

কাহিনি নিয়ে একটু বলি…

৩ মাদকাসক্ত বন্ধু। দুই বন্ধুর মাঝে মাদক নিয়েই বাকবিতণ্ডার পরেই এক বন্ধুর খু  ন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরেক বন্ধুর উপরেই দায় বর্তায়। আর অপর বন্ধুকেও গ্রেফতার করা হয়।

যে বন্ধুকে পুলিশ গ্রেফতার করে,তার বাবা জনপ্রিয় এক নায়ক। যার আবার নারীসঙ্গ নিয়ে বদনামের জন্যে  এডভোকেট স্ত্রীর সাথে বনিবনা নেই একেবারেই।

আবার ভিক্টিম ছেলেটির মাও বিধবা,সাথে আছেন তার অনেক পুরোনো এক বন্ধু শুধু।

আর এ কেসের দায়িত্ব এসে পড়ে ডিবি পুলিশ মইনুল আর তার সহযোগীর উপরে। তারা কি পারবেন রহস্যের সমাধান করতে?

বিশাল ধনী অভিনেতার পুত্র ই কি আসল খু নী? নাকি রহস্যের চাবিকাঠিটা অন্য কারো হাতে?

জানতে হলে দেখুন ছবিটি। বলছি,ভালো লাগবে।

প্রথমে আমি গল্প নিয়ে বলি। এমন গল্প যে আমি আপনি আগে দেখিনি তা নয়। কিন্তু গল্পের বুনোট এত ঠাসা সূতোয় বোনা,আপনি চোখ সরাতে পারবেন না। একই সাথে চরিত্রগুলোর ইমোশনাল জার্নিও আছে এখানে। মইনুলের স্ত্রীকে সময় দিতে না পারা,ওনার মা এবং বউ এর মাঝে স্যান্ডুইচ হয়ে যাওয়া,অভিনেতা পিতার বাইরের সম্পর্ক,সব জেনে শুনেও যোগ্যতা থাকার পরেও স্ত্রীর সাহস না পাওয়া সরে যাবার।

ভিক্টিমের একলা মায়ের একাকীত্বের গল্প,আসলেই কি মেয়েরা শুধু নিজের কথা ভাবতে পারে? দাঁড় করিয়ে দেয় বাস্তবতার সামনে। আবার মুখোমুখি দুই মায়ের সন্তানদের জন্যে কোনো এক জায়গায় এক হয়ে যাওয়া!

যে অন্যায় করছে,তার ও একটা দূর্বলতম জায়গা থাকে,পরিবার! অসুস্থ বাবা,স্ত্রী-সন্তান। আবার অন্যায়কারীর অন্যায় করার পেছনেও অদ্ভুত যুক্তি থাকে!

চিত্রনাট্য একদম মেদহীন,ঝরঝরে। বাড়তি একটা ডায়ালগ ও নেই এতে।

আমাদের সিনেমা নাটকে কিছু কমেডি সিন রাখা হয়,দেখেই বোঝা যায়,এতে জোর করে হাসির দৃশ্য রাখা হয়েছে। এত বড় ছবি,দুই একটা হাসির সিন না থাকলে কেমনে কী টাইপ!

এখানে একেবারেই তা নয়। একদম হুট করে একটা ডায়ালগ আসবে,আর আপনি একদম হা হা করে হেসে ফেলবেন। মইনুল সাহেবের দাম্পত্য জীবন হোক বা ভিলেনদের সাথে কথোপকথন, একদম জমে ক্ষীর।

গানগুলো অনেক সুন্দর। সেভাবে কেন প্রচার করা হলো না,জানি না। ছবির শুরুতেই একদম প্রথম দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেই যখন ছবি এগোচ্ছিল,বুঝেই গিয়েছিলাম,বাকিটা ভালো হবে। তবে সিনেপ্লেক্সের সাউন্ড সিস্টেমে মাঝে মাঝে খুব তীব্র শব্দ হচ্ছিল,আশা করি সেটা কতৃপক্ষ খেয়াল করবেন।

এবার অভিনয়ের কথায় আসি।

মোশাররফ করিমের অভিনয় নিয়ে কথা বলা ধৃষ্টতা। উনি একটা সিরিয়াস সিচুয়েশেনেও হাসাতে পারেন। আবার এই ক্ষণে হাসিয়ে পরবর্তীতে কিভাবে যে ভয় লাগিয়ে দিতে পারেন! একটা ফোনকলে কথা বলতে বলতে হাসি থেকে হঠাৎ কান্নায় চোখ রক্তবর্ণ হয়ে যাওয়া। কিংবা বাকযুদ্ধে সমানে সমান টক্কর। একদম নির্বিকার ভাবে চরম হাসির কথা বলে ফেলা।

শাশ্বত দত্ত,নবীন অভিনেতা। ওনাকে একদম অন্য রকম চরিত্রে দেখা গেছে। সামনে মূর্তিমান মোশাররফ করিম। তার সাথে টাইমিং মিলিয়ে ডায়ালগ বলে যাওয়া,সাথে এক্সপ্রেশনের চেঞ্জসহ,সহজ নয়। একদম যোগ্য সঙ্গত। খাবার টেবিলের দৃশ্যে দুজনের চোখাচোখিতে শব্দহীন কৌতুক সবাইকে হাসিয়েছে।

মৌসুমী নাগ ছিলেন ভিক্টিম ছেলেটির মায়ের চরিত্রে। প্রথমে একজন অসহায় মা,পরে সেই মা অসহায় থেকে কেমন কঠিন হয়ে যান নিজের সন্তানের জন্যে। আবার আরেক মায়ের জন্যে তাঁর মমতাবোধ,আর শেষে নিজের নারীসত্তা আবিষ্কার করা নতুনভাবে! অভিব্যক্তি কী দারুণ।

ঠিক তার বিপরীত চরিত্রের টানাপোড়েন ছিল অপরাধী ছেলেটার মায়ের চরিত্রে। প্রথমে অহংকারী,পরে অসহায়ত্ব, শেষে সাহসী হয়ে যাওয়া,আর সন্তান হারানো মায়ের প্রতি ভালোবাসা,আর শেষ দৃশ্যেও অসাধারণ ছিলেন তারিন।

Intekhab Dinar ,সাপোর্টিভ বন্ধু হিসেবে কাজ করেছেন। যিনি বন্ধুর জন্যে যে কোনো কিছু করতে পারেন,সারাজীবন স্তম্ভের মতো পাশে থাকতে পারেন। তার চরিত্রের বিন্যাস ও চমৎকার।

রওনক হাসান,অহংকারী অভিনেতা,যে নিজের দোষ,দায়টুকু বুঝতেই পারেন না। নিজ জগতে ব্যস্ত পিতা,পিতা হিসেবে ব্যর্থতাও মেনে নিতে পারেন না। সুন্দর অভিনয় করেছেন।

মোশাররফ করিমের মায়ের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন,ওনার কমিক টাইমিং দারুণ। উনি এ ছবির আরেকজন কমিক রিলিফ। এছাড়াও ছিলেন ভিলেন চরিত্রের একজনের স্ত্রী,ভালো অভিনয় করেছেন। বাবা  চরিত্রের অভিনেতাও ভালো কাজ করেছেন।

ছিলেন রিতিকা নন্দিনী শিমু,দাম্পত্য জীবনের খুনসুটি, অভিমানে চমৎকার। কাইজারের শিরিন বা রুমিতে সহকারী,আপনার কাজ খুব ভালো লাগে।

সবশেষে আসি সুমন আনোয়ারের কথা। কী অভিনয় যে করলেন আপনি! মইনুলের সাথে মুখোমুখি তর্কযুদ্ধ বা হাতাহাতি,আবার তার পেশার প্রতি সম্মানবোধ,আর শেষের দিকে পুরো লাইমলাইট নিজের দিকে নিয়ে নেওয়া! আপনি অসাধারণ! বা শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না।

Saraf Ahmed Zibon এই যে এতকিছুর কথা লিখলাম,এতজনের অভিনয়ের কথা বললাম,আপনি ছিলেন ক্যাপ্টেন অফ দ্যা শিপ।

সরকারী অনুদানের ছবি ছিল।

সেদিন আপনার একটা ইন্টারভিউ দেখলাম,আরেক ছবির স্ক্রিনিং এ। আপনি সেখানে বলেছেন,আপনি আন্ডারডগ। না ভাই,আপনি এবারের ছবির মাঝে ডার্ক হর্স।

প্রথম ছবিতেই এত ডিটেইলিং এ যাওয়া,চিত্রনাট্য এত শার্প হওয়া,বাঘা বাঘা সব অভিনেতার মান রেখে চরিত্র লেখা,সিচুয়েশনের টাইমিং মিস না করা,সহজ নয়।

আপনার প্রথম কাজ,যেন অনেকগুলো ভালো কাজের মাঝে একটি হয়।

আপনার ভক্ত হয়ে গেলাম।

হ্যাঁ,এই ছবির শো কম। তাই দর্শকদের বলছি,ওয়েবসাইটে চেক করে হলে গিয়ে দেখে আসুন।

বাংলা ছবির পাশে থাকুন।

নিজের দেশের ভালো ছবির পাশে থাকাও যে গর্বের।

- Advertisement -

Read More

Recent