অসম্পূর্ণতায় পূর্ণতা

সংসারটা কেমন যেন এক নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে পরিণত হয়েছে

নদী আজ একটু আর্লিই শুয়ে পড়লো। কাল সকালে টেস্টগুলো করে তারপর অফিসে যাবে।আসিফও শুয়ে পড়েছে।প্রথমদিন কেমন কাটলো কে জানে! কিছুই বললো না…

এ এক অদ্ভুত রকমের  মানুষ । কখনো কোনকিছু নিজ থেকে বলেনা।নির্দিষ্ট কিছু কথার বাহিরে তার যেন আর কোন কথা নেই।

- Advertisement -

সংসারটা কেমন যেন এক নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। একই রুটিন, একই কাজ। কোথাও কোন বৈচিত্র্যতা নেই। আবেগ, অনুভূতি, ভালোলাগা, ভালোবাসার কোন প্রকাশ নেই।

কিন্তু নদীরতো অনেক গল্প জমা পড়ে আছে, অনেক অনেক কথা জমে আছে, চাপা পড়ে আছে কত স্বপ্ন, কত চাওয়া…

কিন্তু কেউ কখনো সে স্বপ্ন, সে গল্পের কথা জানতে চায়নি।তবে সব গল্প, সব স্বপ্ন যে সব সময় সবাইকে বলা যায় তা ও কিন্তু না।কিছু গল্প, কিছু চাওয়া নিজের ভিতরই কবর হয়ে যায় অথবা ধূলো জমে জমে এক সময়  হারিয়ে যায় ..

আসিফের নাক ডাকার শব্দ বেড়েই চলেছে। এমন শব্দে কি ঘুম আসে! নদীর কেন যেন মনে হচ্ছে আসিফ  কোন কারণে ডিসটার্বড হয়ে আছে।খুব টেনশনে থাকলে ও স্মোকিং করে। না হয় এ অভ্যাসটা ওর নেই।ঠিক কি নিয়ে ও টেনসড কে জানে! জিজ্ঞেস করেও লাভ হবেনা….

মন চাইলে বলবে না হয় বলবেনা…

আসিফের মাথার নিচ থেকে বালিশটা সরিয়ে নিতেই নাক ডাকার শব্দ কিছুটা কমে আসলো।নদীরও ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে…

সকালে ঘুম থেকে উঠেই নদী দেখে টেস্টের আগেই ঘটনা ঘটে গেছে। জামা কাপড় সব নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু  নদী কোনভাবেই বিশ্বাস করত পারছেনা নদীর পিরিয়ড  এমনিতে অফ ছিল।নদীর ধারণা জার্নি আর ঝাঁকুনির কারণেই হয়তো নদীর পিরিয়ড হয়ে গেছে। আর না হয় নদী যা ভেবেছে ঘটনা তাই হত।সে যাই হোক আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া । অনেক বড় একটা চাপ থেকে মুক্তি পেল।

তবে  ডক্টরের দেয়া বাকি টেস্টগুলো করে নিতে হবে।শরীরট এমনিতেও ভালো যাচ্ছে না।অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে…

নদীর পুরো শরীর কেমন যেন অবস হয়ে আছে।উঠে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে।

আজ অফিসে যেতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।দীপক স্যারকে কি  একটা টেক্সট করে দিবে!! মালিহা ও ছুটিতে… আচ্ছা ঔষধ খেয়ে যদি ভালো লাগে….

-আসিফ,একটু উঠবে।আমার…

পেইন কিলার শেষ। একটু এনে দিতে পারবে?

-কেন কি হয়েছে…

-আমার…

বলেছিনা হয়ে যাবে। অস্হির হয়ে গিয়েছিলে…

আর কিছু ঘটার জন্য তো একটা কারণ লাগবে!!! থাকি তো দু’জন…

আমি বুঝতে পারছিনা এ কথাগুলো কি তোমার বলার কথা না আমার!!!

যাক আমি কথা বাড়াতে চাইছিনা..

পারলে ঔষধটা এনে দাও…

আসিফ উঠে ওয়াশরুমের দিকে গেলো।

আজ সুমি অনেক আগেই এসেছে।নদী উঠার আগেই সব রেডি।

-সুমি, আমাকে  হট ব্যাগটা একটু রেডি করে দে। আর সবার জন্য টেবিলে নাশতা দে।

-আন্টি,  দাদী এখন খাবেনা বলছে। ওনারে পরে দিতে বলছে।

-ও আচ্ছা।

নদী  আরিককে রেডি করে নাশতা সেরে নিলো।।আদৃতা ও স্কুলের জন্য রেডি হলো।–

সুমি হট ব্যাগ আর ঔষধ দিয়ে গেলো।কিন্তু এখন আর হট ব্যাগ দিয়ে শুয়ে থাকার সময় কোথায়!!

-আসিফ তুমি কি বাচ্চাদেরকে একটু ড্রপ করে যেতে পারবে?

না, আমাকে আজকে  একটু আগে বের হতে হবে…

-আচ্ছা ঠিক আছে।তুমি যাও…

নদী রুমে এসে অফিসের জন্য রেডি হলো

কিন্তু যেতে একদমই ইচ্ছে করছে না।তারপরও কি করবে!!! জবটা এখনও permanent  হয়নি।তাই ইচ্ছে না করলেও যেতে হবে…

নদী বাচ্চাদের নিয়ে বের হলো।রিয়া আপা মেসেজ করেছে – আজ বিকালে দেখা করতে চায়।

নদী কোন রিপ্লাই না দিয়ে মোবাইলটা  ব্যাগে রেখে দিলো।। কিছু জানাতে ইচ্ছে করছেনা।এছাড়া নদী এটাও বুঝতে পারছেনা নদীর সাথে ওনার  কি এমন কথা থাকতে পারে!! সব কথার তো শেষ হয়েছে বহু আগে…

আমার ভাইয়ের জীবনটাতো পুরোই শেষ করে দিয়ে গেছে। অথচ ভাইয়া কত ভালোবাসতো আপুকে!আব্বু আম্মু ও মেনে নিয়েছিল সব।স্বার্থপরের মতো

বেটার পেয়ে ছেড়ে গেলো….

এখন কি এমন হলো যে….

এ মানুষ গুলোর জন্য কত জীবনই না এলোমেলো হয়ে যায়।!এরা সব সময় সম্পর্কে লাভ লোকসান খুঁজে বেড়ায়।নিজেরাই সম্পর্কে জড়ায়।তাদের ভালোবাসার বাণী আর আবেগে পড়ে বিপরীত মানুষটি যেই না দুর্বল হয়ে পড়ে –ঠিক তখনি  তারা অন্য জায়গায় নৌকা ভিড়ায়।এ কথা ভাবতে ভাবতেই নদীর মনে হলো নদীও কি সজীবের সাথে এমন কিছু করেছিল!!! নদীও কি তাহলে সেইম অপরাধী!!!  কিন্তু নদী আর সজীবের মাঝে তো কোন ভালোলাগা, ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না। যদি কিছু থেকেও থাকে তা ছিল সজীবের। নদীর তো এতে কোন দোষ ছিল না!!  তারপরও নদী  আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনা…

নদী হাতের কাজগুলো সেরে বেরিয়ে পড়লো।রিয়া আপার সাথে দেখা করে আসিফের জন্য একটু শপিং করবে।যদিও হাত একেবারে ফাঁকা। নতুন জয়েন করেছে। কয়েকটা  শার্ট  কিনতে হবে।

রিয়া আপা  বসে বসে কফি খাচ্ছে। ওনার পাশেই ৫/৬ বছরের একটা বাচ্চা খেলছে।একবার এই টেবিল তো আর একবার ঐ টেবিলে…

বাচ্চাটিকে দেখে নদীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো।মেয়েটির চেহারাটার সাথে ভাইয়ার চেহারার অদ্ভুত একটা মিল আছে।মনে হচ্ছে ছোট্ট নাদিম হেঁটে বেড়াচ্ছে। এও কি সম্ভব!!!

-স্যরি আমার একটু লেট হয়ে গেলো।শরীরটা ভালো ছিল না।এছাড়া অফিসেও অনেক কাজ ছিল।

– ইটস ওকে।এসেছো তাতেই ধন্যবাদ.. – – – – এবার বলো কেন ডেকেছো???

– নাদিম কেমন আছ,নদী?

– জ্বী ভালো।আপনি কেমন আছেন? দেশে থাকবেন, নাকি…

– এ মাসটা আছি।ছুটিতে এসেছি। ওখানে একটা ছোটখাটো জব করি। তাই চাইলেও বেশিদিন থাকা পসিবল নয়

-হুম…

-বাসার সবাই কেমন আছে?  আন্টি,নাইম স্মৃতি…

-নাইমও নাকি বিয়ে করেছে??

– সব খবরই তো জানেন দেখছি…

-সুজাতার সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়।ওর থেকে শুনেছি…

-আপু কিছু বলার থাকলে একটু আর্লি বলো।আমার কিছু কাজ আছে…

-অনেক রাগ আমার উপরে তাই না!!! নদী আমি  স্যরি। পারলে আমাকে তোমরা ক্ষমা করো।আমার জন্য তোমাদেরকে অনেক সাফার করতে হয়েছে।আমি জানি, একটা স্যরি দিয়ে কখনো এগুলোর ক্ষমা হবেনা….

নাদিমের সাথে আমি অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি।পরে শুনলাম ও বিয়ে করে সেটেল হয়েছে। শুনে অনেক খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু তারপরই জানলাম….

-হুম ভাইয়ার ডিভোর্স হয়েছে।আর যা হবার হয়ে গেছে। আপনিও সেটেল হয়েছেন… আপনারও সংসার হয়েছে। এখন আর পিছনে কি হয়েছে তা ভেবে তো লাভ নেই। তবে আপনার দেয়া আঘাত ভুলতে ভাইয়ার অনেকদিন সময় লেগেছে…

-নদী, আমার আর নাদিমের একটা সন্তান আছে।

-কি?????

নদীর মাথা ঘুরছে। এমন কিছু শোনার জন্য নদী মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তাহলে কি এ ছোট্ট মেয়েটা…

না, না তা কি করে সম্ভব! জীবন কি কোন সিনেমা নাকি!!!

-এসব কি বলছেন আপনি??? এতোদিন পরে এসে এসব ….

– এটাই সত্যি। কখন হলো, কিভাবে হলো আমি এখন  আর তা বলতে চাইনা। তবে এটুকু বলবো নাদিম  বিষয়টি জানেনা।আমাদের রিলেশনটা একটু অন্যদিকে বাঁক নিয়েছিল।আমরা নিজেরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেই। পরে সবাইকে জানাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু এর মাঝেই রাহাতের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়।আমি বাসায় নাইমের কথা বলেেও লাভ হয়নি।বাবা বিষয়টি মানতে চায়নি।রাহাতের সাথে বিয়ের পর পরই আমি কানাডা  চলে যাই।আমি যখন কানাডা যাই  তখনই আমি তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা। সত্যি বলতে আমি নিজেও  বুঝতে পারিনি কিছু। ওখানে যাওয়ার পর বিষয়টি বুঝতে পারি।কি করবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।abortion করার চেষ্টা করি।কিন্তু ডক্টর পারমিট করেনা।রাহাতকেও সত্যিটা বলতে পারছিলাম না। নাইমের সাথে যোগাযোগের ট্রাই করি। কিন্তু কোন মুখে ওকে ফেইস করবো, কি বা বলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেক কষ্টে সুজাতার নাম্বার যোগাড় করি। কিন্তু পরে জানতে পারলাম নাদিম বিয়ে করেছে। তাই  ওর  জীবনে আর নতুন কোন ঝামেলা তৈরী করতে চাইনি।আর  যার হাত ধরে  বিদেশি  পাড়ি জমিয়েছি সেও এক সময় সব জেনে যায়। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের সম্পর্কও ডিভোর্সে গড়ায়।প্রকৃতি  নাইমের হয়ে আমার উপর প্রতিশোধ  নিয়ে নিয়েছে। আমি এতো বড় একটা সত্য আর বহন করতে পারছিলামনা।তাই তোমাকে জানিয়ে গেলাম। সামনের মাসের ৭ তারিখ আমার ফ্লাইট। আর কখনো দেখা হবে কিনা তাও জানিনা…

আর নাদিমের মুখোমুখিও আমি আর কোনদিন হতে পারবো না…আমি বা আমার মেয়ে কখনো কোন অধিকার নিয়ে ওর সামনে আসবো না…

শুধু বলো, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিতে।।

এ কথাগুলোর কি উত্তর হয় নদী জানেনা।কেবল অবাক হয়ে কথাগুলো শুনছে।।কিছু সত্য গোপন থাকাই তো ভালো।কেন সবাইকে সব জানতে  হবে!  কেন!!  মানুষের জীবন মাঝে মাঝে সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

নদী বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে

কি নিস্পাপ চেহারা…

সে কি জানে তার জীবনটাও শুরু হয়েছে একটি অপূর্ণতার গল্প দিয়ে…

- Advertisement -

Read More

Recent