
দক্ষিণা বাতাস বইছে চারিদিকে।নিজের কেবিনের দক্ষিণদিকের জানালা মুখো হয়ে দাড়িয়ে মেয়েটি। রাত এখন সাড়ে আট’টা , সবেই একটা সার্জারি শেষ করে নিজের কেবিনে ঢুকেছে মেয়েটা। মনটা ভালো নেই, অবশ্য মন আদৌও কবে ভালো ছিলো সে বিষয়ে খোঁজ চালানোর পরেও জানা যাবে কিনা সন্দেহ।
মেয়েটির ভাবনার মাঝেই দরজায় নক পড়লো। আর দাড়ালো না মেয়েটি দীর্ঘশ্বাসটুকু নিজের ভিতরেই জমা রেখে পা বাড়ালো নিজের জন্যে বরাদ্দকৃত চেয়ারটিতে। এখন থেকে টানা একঘন্টা পেশেন্ট দেখে আবার ফ্ল্যাটে ও তহ ফিরতে হবে!
_______________
খান নিবাসের পারিবারিক মিটিং রুমে ঘন্টা খানেক ধরে আলোচনা চলছে।বাড়ির সকল সদস্য উপস্থিত রুমটায়।বরাবরই খান বাড়ির ছোট বড় সকল গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে বাড়ির গৃহিণীদের ভূমিকা থাকে পরিবারের আর বাকি সদস্যের মতোই। শাহজালাল খান শাহরিয়ার আর শওকত খান দশটা নাগাদ বাড়িতে ফিরেই সকলকে মিটিং রুমে ডেকেছেন।শেহজা আজ ফিরছে না সে কথা দুপুরেই ফোন করে জানিয়েছিলেন শাহজালাল খান। শোয়েব খানের আর ফারহানা খান সন্ধ্যা নাগাদই হসপিটালের পার্ট চুকিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি ফিরেছেন। সব বিষয়ে শক্ত থাকা ফারহানা খান মেয়ের বিষয় আসলেই নমনীয় হয়ে উঠেন। অবশ্য শুধু ফারহানা খান নয় বরং খান বাড়ির প্রতিটি সদস্যই শেহজার প্রসঙ্গ উঠলেই নমনীয় হয়ে উঠেন। যার জলন্ত প্রমাণ রুমে উপস্থিত সকলের মুখমন্ডলে থাকা চিন্তিত আভাতেই ফুটে উঠছে। সুদীর্ঘ এক ঘন্টা আলোচনার পরেও তেমন কোন বিশেষ পয়েন্ট দাড় করাতে সক্ষম হয়নি উপস্থিত কেউ। হৃদভিক শেখ সমস্ত গুটি নিজের আয়ত্তে রেখেই যে মাঠে নেমেছেন কারো বুঝতে বাকি নেই আর৷ সুদীর্ঘ রাজনীতির জীবনে এমন বহু বড় বড় সমস্যা সমাধান করেছেন শাহজালাল খান, কিন্তু আজ কেন জানি মেয়ের বেলাতে এসেই নিরুপায় হতে হচ্ছে উনাকে। ভিডিওটা হৃদভিকের আয়ত্তে এমন করে আছে যে, সে চাইলেই কয়েক ঘন্টাতেই শাহরিয়ার পদত্যাগের বিষয়টা নিজের সুবিধা মতো চালিয়ে নিতে পারবে। ভিডিওটা ফেক নয়, শাহরিয়ার সেদিন গিয়েছিলো হাবিবুর কবিরের অ্যাপার্টমেন্টে, কিন্তু সেটা অন্য আরেক কারণে,ওই ফ্ল্যাটে যা ঘটেছে সেটা শাহরিয়ার বেরিয়ে যাওয়ার পরে।হাবিবুর কবিরের কেসটা এখনো সচল।হৃদভিকই যে শাহরিয়ার আসার যাওয়ার সেই ক্লিপ টুকু সরিয়ে ফেলেছে সেটা ধরতে সময় লাগেনি কারোর। হাবিবুর কবিরের আকর্ষিক মৃত্যুতে শাহজালাল খানরাও খানিকটা টেনশনে পরে গিয়েছিলেন সেদিন, যেহেতু শাহরিয়ার গিয়েছিলো হাবিবুর কবিরের মৃত্যু কয়েকঘন্টা আগে ওর ফ্লাটে।শাহজালাল খান নিজের তত্ত্বাবধানে থাকা লোকদিয়ে শাহরিয়ারর আসা যাওয়ার ক্লিপটুকু সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সঠিক সময় পেরিয়ে গিয়েছিলো সেদিন। তাই অপেক্ষা করা ছাড়া তেমন কিছুই করার ছিলো না শাহজালাল খানদের।সময় যেতেই যখন সবটা শান্ত দেখলো, কপালে বাজটা অবশ্য ওদের সকলেই পড়েছিলো, কারণ পরিবেশ এতক্ষণে অন্য রূপ ধারন করার কথা ছিলো৷ অবশ্য তখন হিসাব না মিললেও সবটা সেদিন ঠিকই মিলে গিয়েছিলো যেদিন শাহরিয়ার ফিরে জানালো, আরহাম আদনান দুজন ওকে সিসিটিভি ফুটেজ বিষয়ক কিছু জরুরি কথা বলতে ওদের গাড়িতে নিয়ে বসিয়ে ছিলো৷ শাহজালাল খান তখন থেকেই এমন কিছু হবে আচঁ করতে পারছিলেন৷ অভিজ্ঞ ধারনা অবশেষে মিলে গেলো।
“নেতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, ভাইয়ের দায়িত্ব পালনে অপারগ হয়ে গেলাম।” তেজহীন ঠান্ডা গলায় কথাটুকু বলে উঠলো শোয়েব খানের পাশের সোফাটা দখল করে বসা শাহরিয়ার। ভিতরের দাবানলটাতে শান্ত স্রোতে পরিণত করে বসে আছে শাহরিয়ার।বড়দের সামনে নিজের রাগ কোনকালেই বের করে না শাহরিয়ার। শান্ত রূপের ভিতরটা কতটা অশান্ত বুকচিরে ফাঁক করলে হয়তো সকলে দেখতে পেতো।আদরের স্নেহের চাদরে বড় করা বোনটাকে আজ ওর জন্য বাড়ি ছেড়ে থাকতে হচ্ছে,এতটুকু ভাবনায় আসলেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে শাহরিয়ার। শুধু মাত্র সময়টা পক্ষান্তরে ঘুরে ওদের দিকে আসলেই, হৃদভিক শেখ এসবের যোগ্য জবাব পাবে, আপাতত এতটুকু বলে নিজেকে শান্ত রাখার বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে শাহরিয়ার।
“সময়ের উপরে,সবটা ছেড়ে দেয়া ছাড়া আপাতত কিছু করার নেই।প্রিন্সেসকে আরো কিছুদিন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তেই থাকতে হবে। এতটুকু বলে কিছুটা থেমে শওকত খান আবারো বলে উঠলেন,‘মন শক্ত করো শাহরিয়ার। সামনে অনেক দায়িত্ব তোমার কাঁধে। খান পরিবারে ছয় পুরুষকে পেরিয়ে কারো হিম্মত নেই শেহজা খানের দিকে চোখ তুলে তাকানোর।’।
স্বামীদের দৃঢ় মনোবল দেখে উপস্থিত তিন রমনী নিজেদের দুঃখটুকু আর প্রকাশ করল না। রুমে উপস্থিত পাঁচ পুরুষই ওদের কলিজার টুকরোটাকে দূরে রেখে কতটুকু কষ্টে রয়েছে, সেটা বলার আর প্রয়োজন পড়ে না।
__________
“শেহজা বিনতে শোয়েব,উঁকিঝুঁকি না দিয়ে চাইলে রুমে ঢুকতে পারেন।”
তৃতীয় তলার দ্বিতীয় রুমের সামনে দাড়িয়ে ছিলো শেহজা৷ দুমিনিট হলো, তৃতীয় তলায় উঠেছে সে।কিছুক্ষণ আগে হৃদভিককে তৃতীয় তলায় উঠতে দেখেছিলো শেহজা। যেহেতু সকালে হৃদভিক নিজেই অনুমতি দিয়েছিলো, তৃতীয় তলা ব্যতিত নিজ ইচ্ছে মতো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তে পদচারণ করতে পারবে শেহজা, তাই আজ সারাদিনই বাড়িময় টইটই করছিলো শেহজা।নোভার দেখা নেই কাল থেকে,শুধু নোভা নয় বরং হৃদভিক ব্যতিত দ্বিতীয় কোন পুরুষ এখনো শেহজার চোখে পড়েনি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তে। রাত সাড়ে নয়টা নাগাদ বাহির থেকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তে প্রবেশ করেছিলো হৃদভিক। শেহজা তখন ড্রয়িংরুমের সোফা বসে ইকোকে বাদাম খাওয়াচ্ছিলো। শেহজাকে দেখেও তেমন কোন প্রশ্ন না করে সরাসরি দোতলায় উঠে গিয়েছিলো হৃদভিক। শেহজা অবশ্য আড়চোখে দেখেছিলো, হৃদভিক দোতলায় নিজের রুমে ঢুকে মিনিট দশেক পড়েই ড্রেস চেঞ্জ করে তৃতীয় তলায় উঠে গিয়েছে। কি মনে করে জানি শেহজাও পিছু নেয় হৃদভিকের। ফোনটা রুমে ছিলো, তাই ইকোকে নিয়ে প্রথমে রুমে গিয়ে ওকে কাঁচায় রেখে, বিছানা থেকে ফোনটা তুলে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে শেহজা, তৃতীয় তলার উদ্দেশ্য।
“রুমটা সুন্দর। গম্ভীর মানুষদের রুম অবশ্য এমনই হওয়া উচিত।দেয়ালের ধূসর রংটা আপনার সাথে বেশ যায়।”
মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে কথাগুলো একনাগাড়ে বলে থামলো শেহজা। সুযোগ জিনিসটা মুটেও হাত ছাড়া করে না শেহজা। বলতে গেলে এটা ওর বিরাট বড় একটা গুণ। তৃতীয় তলার সব কয়টা রুমের ভেতরটা, স্বচক্ষে দেখতে চাওয়ার ইচ্ছে প্রথম দিনই মনে জেঁকে বসেছিলো শেহজার। আজ যখন নিজে থেকে সুযোগটা পেয়েছে তাই আর সেকেন্ড সময় ব্যয় করেনি শেহজা, হৃদভিক বলতে দেরি রুমে প্রবেশ করতে দেরি করেনি শেহজা। রুমে ঢুকেই পুরো রুমময় দুবার জহুরি চোখে পলক করে নেয় শেহজা। বলতেই হবে, দক্ষ হাতে সাজানো এই রুম।সোফা থেকে শুরু করে, একটা কম্পিউটার টেবিলে, একটা বড় ক্যাবিনেট, একটা কাঠের কারুকাজ করা ওয়ারড্রব,কফি মেশিন থেকে শুরু করে মিনি সাইজের একটা ফ্রিজ, সাথে রুমের একপাশে বোধহয়, বড় একটা বেলকনিও রয়েছে, যেটা আপাতত পর্দা দিয়ে আড়াল করা।
“কমপ্লিমেন্টের জন্যে ধন্যবাদ। বসুন।” সোফার দিকে ইশারা করে কথাটুকু বলে উঠলো হৃদভিক।খাটের হেডসাইটে পিঠ ঠেকিয়ে কম্পিউটারে,নিজের তুলে রাখা কাজগুলো শেষ করছিলো হৃদভিক। হৃদভিকের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ছোট থেকেই ওর সমবয়সী আট দশ জনের চেয়ে দ্বিগুণ প্রখর ছিলো। বিশেষ করে ওর আশেপাশে কেউ হাটলে বা রুমের বাহিরে করিডর দিয়েও যদি কেউ হাটা চলা করে হৃদভিকের কানে সেই পদচারণ স্পষ্ট ভাবেই ধরা দেয়৷তৃতীয় তলায় কেউ এসেছে হৃদভিকের কানে সেটা ধরা পড়তেই, সিসিটিভি অন করে চেক করে কনফার্ম হয়ে নেয় হৃদভিক, কারণ ওর ধারণা ভূল নয় শেহজা’ই এসেছে৷
“সরি, বসতে আসিনি, দেখতে এসেছি। দেখা শেষ এখন চলে যাচ্ছি।” কথাটুকু বলে পিছন ফিরে হাটা ধরলো শেহজা।
হৃদভিক কিছু বললো না, বরং শেহজা চলে যেতেই, কিঞ্চিত ঠোঁট বাঁকানো । হৃদভিক শেখের তৈরি গভীর বদ্ধ প্রাচীরটার খোঁজ পাওয়া এত সহজ নয়। কারণ প্রাচীরটার প্রতিটা কিনারায় পাহারাদারের দায়িত্বে রয়েছে স্বয়ং হৃদভিক শেখ। আর হৃদভিক শেখকে টপকে,সামনে এগোনোটা ততটাও সহজ নয়৷
______
“তাহলে এটাই ফাইনাল, আমরা সিলেট সামনে মাসে আসছি। ভিডিও কলে থাকা অপরপাশের মানুষটির উদ্দেশ্যে ফোনে এপাশে থাকা পাঁচ জনের মধ্যে থেকে তাসনিম কথাটুকু কথা বলে উঠলো। পুরো নাম হুমায়রা তাসনিম।
“হুম, হুরকেও তোদের সঙ্গে নিয়ে আসিস। মারিপু ওকে আগের বার মিস করেছিলো খুব।” এতটুকু বলে কিছুটা থেমে
অপরপাশ থেকে রিদিশা আবারো বলে উঠলো, ‘নানাভাই কেমন আছেন? এতক্ষণে তহ বোধহয়, ঘুমিয়ে পড়েছেন উনি?”
“জ্বি, আপু।দাদু সাড়ে নয়টা নাগাদই ডিনার সেরে রুমে ঘুমাতে চলে যায়।” এপাশ থেকে কথাটুকু বলে উঠলো, তাসনিয়া। পুরো নাম হুমায়রা তাসনিয়া।
“হাবিবা, কি মেডিকেলের ফাইনাল ইয়ারে এবার?”ফোনের অপরপাশে থাকা হাবিবা দিকে তাকিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করে উঠলো রিদিশা।
“না আপু, এবার তৃতীয় বর্ষে আছি৷” এপাশ থেকে ফোনের অপর পাশে থাকা রিদিপুর প্রশ্নের জবাবে কথাটুকু বলে উঠলো হাবিবা। পুরো নাম হাবিবা তুল কুবরা।
“ওহ।”ফোনের এপাশ থেকে এতটুকু বাক্য উচ্চারণ করার পরপরই এবার ফোনের অপরপাশে থাকা হৃদিতার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো রিদিশা ,‘হৃদি,মাইগ্রেনের ব্যথা এখনো আছে?”
“জ্বি,আপু। বাট আগে থেকে এখন কিছুটা বেটার লাগছে।”
রিদিশার প্রত্যুত্তরে কথাটা বলে উঠলো হৃদিতা।
এইভাবেই আরো কিছুক্ষণ বোনদের সাথে একান্ত কতক্ষণ সময় কাটিয়ে বিদায় নিলো রিদিশা এপাশ থেকে। ঘড়িতে সময় এখন সাড়ে বারোটার কাছাকাছি, হিসাব করলে দেখা যাবে টানা একঘন্টা বোনগুলোর সাথে কথা বলেছে রিদিশা। এমন নয় নিয়মিত কথা হয় বোনগুলোর সাথে।ওই তহ দিনক্ষণে যদি চোখ বুলায় তাহলে দেখা যাবে এক মাসে দুই কি তিন দিন কথা হয় ফোন কলে বোন গুলো সাথে রিদিশার। সমবয়সী নয় বরং রিদিশা থেকে কয়েকবছরের ছোট ওরা।
সামনের সপ্তাহে সিলেট আসার প্ল্যান করেছিলো ওরা। কিন্তু যখন শুনলো মারিপু দুইদিনের ছুটি কাটাবে সামনের মাসে তখনই ডিসিশন পাল্টে সামনের মাসে সিলেট আসার প্ল্যান করলো ওরা।সাত বোন একসাথে সুন্দর সুন্দর কিছু মুহুর্ত কাটাবে,এমনি কত কত প্ল্যান করছিলো ফোনকলে থেকে ওরা। রিদিশা তখন শুধু ওদের হ্যাঁ তে হ্যাঁ বলছিলো। একাকিত্বের ঘেরানো শক্ত খোসলের ভিতরে এক ছটাক সুখ এনে দাঁড় করায় রিদিশা আর মারিয়ার জীবনে, ওদের মামাতো বোনগুলো।লাস্ট যখন ঢাকা থেকে ফিরেছিলো রিদিশা, তখন কত ছোট ছিলো বোনগুলো।সময় কত দ্রুত পার হয়।এতটুকু মনে মনে ভাবতেই হুট করে বিষন্নতায় ছেয়ে গেলো রিদিশার মন মস্তিষ্ক। একান্ত পুরুষটার কথা ছেকে ধরলো হৃদয় গহীন। আর বসলো না রিদিশা, পা বাড়ালো বেলকনির দিকে। ঘণ্টা খানেক সেখানে বসবে, কিছুক্ষণ ডায়েরি লিখবে। তারপর মধ্যরাতে ফিরে আসবে রুমে। এই তহ রিদিশা মাহরিনের নিত্যদিনের রুটিন।
