
উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে কানাডা সরকার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা শুরু করেছে। এ উপলক্ষে ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহের জন্য একটি জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০ তারিখ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি চলবে আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত।
এই সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতামত জমা দেওয়ার পাশাপাশি টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার, মন্ট্রিয়ালসহ প্রধান শহরগুলোতে খোলা আলোচনার আয়োজন করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য গত পাঁচ বছরে ইউএসএমসিএ চুক্তির বাস্তবায়নে কানাডার বিভিন্ন খাত কতটা লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা স্পষ্টভাবে জানা এবং আসন্ন পুনঃআলোচনায় জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখা।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে কানাডার মোট রপ্তানির ৭৫ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং আমদানির ৬৩ শতাংশ এসেছে সেখান থেকেই। ইউএসএমসিএ চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এই নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে অটোমোবাইল, কৃষি, দুগ্ধ ও প্রযুক্তি খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে।
কানাডার দুগ্ধশিল্প ইউএসএমসিএ চুক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি। গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে কানাডিয়ান উৎপাদকদের অংশীদারিত্ব প্রায় ৯% কমে গেছে। কৃষক সংগঠনগুলো বলছে, তারা পর্যাপ্ত বাজার সুরক্ষা না পাওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
অন্যদিকে অটোমোবাইল খাতে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। উত্তর আমেরিকার অভ্যন্তরে উৎপাদিত যানবাহনের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকায় কানাডার গাড়ি শিল্প রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখেছে। এটি মূলত চুক্তির আঞ্চলিক কনটেন্ট রুলের কারণে সম্ভব হয়েছে।
শ্রমবাজারে ইউএসএমসিএর প্রভাব ছিল দ্বিমুখী। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে অনেক উৎপাদন ইউনিট খরচ কমানোর লক্ষ্যে মেক্সিকোয় স্থানান্তরিত হয়েছে, ফলে কানাডায় প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর অভিযোগ, শ্রম অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে শ্রমশোষণ বেড়েছে, বিশেষত নিম্নবেতনভুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে।
তবে প্রযুক্তি সেবা, কৃষিপণ্য রপ্তানি ও খনিজ খাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে শ্রমনীতি ও পরিবেশনীতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কৃষক সংগঠন বলছে, মার্কিন পণ্যের ভিড়ে তারা বাজারে টিকে থাকতে পারছে না। শ্রমিক ইউনিয়ন অভিযোগ করছে, বাস্তবে শ্রম অধিকার রক্ষা হচ্ছে না, বরং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেতন কমে গেছে। ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, ইউএসএমসিএ না থাকলে বাজারে স্থিতিশীলতা নষ্ট হতো, তাই চুক্তি চালু রাখা জরুরি। সমালোচকরা বলছেন, ইউএসএমসিএ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে, ফলে কানাডার কৃষি ও শ্রম খাত তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
কানাডা সরকার আসন্ন আলোচনায় বিশেষভাবে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেবে দুগ্ধ খাতে সুরক্ষা জোরদার, শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও নীতি প্রণয়ন। এছাড়া নতুন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাণিজ্যে কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও আলোচনার এজেন্ডায় থাকবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনমত সংগ্রহ শুধু ইউএসএমসিএ চুক্তির আলোচনাতেই নয়, ভবিষ্যতের বাণিজ্য নীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ এতে জনগণ ও শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা উঠে আসবে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য দিকনির্দেশক হবে।
সব মিলিয়ে ইউএসএমসিএ চুক্তির এই প্রথম আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা কানাডার অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও শ্রম খাতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। সরকার যদি সঠিকভাবে জনমতের প্রতিফলন আলোচনায় তুলে ধরতে পারে, তাহলে আগামী বছরগুলোতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক এবং টেকসই বাণিজ্য পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
