
তখন মন্ট্রিয়ল থাকি। প্রাণের শহর, সংস্কৃতির শহর। বাণিজ্য আর যন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট উত্তর আমেরিকার অন্য নগর গুলির মতো নয়। বছর জুড়ে উৎসব লেগেই থাকে। উৎসবের ঢেউ উপচে পড়ে পৌনে তিনশো কিলো দূরে মন্ট-মরেন্সি জলপ্রপাতে। নায়াগ্রার চেয়েও ৩২ মিটার বেশি উঁচু থেকে জলের পতন। প্রকৃতিপ্রেমী ফরাসিরা যান্ত্রিক হতে দেয়নি জায়গাটিকে। প্রকৃতির ভেতর লুকিয়ে রেখেছে। আশে পাশে বহুতল হোটেল দূরে থাক, দোতলা মোটেল পর্যন্ত গড়তে দেয়নি।
তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মন্ট-ট্রেম্বল্যান্ট। ফরাসি উচ্চারণে মোঁথ্রাম্বলাঁ বা অন্যকিছু। আজো ঠিকঠাক উচ্চারণ পারিনা। মন্ট্রিয়ল ছেড়ে ঘন্টা দেড়েকের পথ। ইউনিভার্সিটি ছুটি হলেই ছুটতাম পুরো পরিবার নিয়ে। কী শীত, কী তুষারপাত, কিংবা মেঘের চাদর ঢাকা থাকলেও।
শীতকালে স্কী স্কেটিং সহ অনেক এ্যাক্টিভিটিজ থাকে এখানে। গ্রীষ্মে বিদেশি মানুষে গিজগিজ করে। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ইউরোপ ও জাপান থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘুরতে আসে। পাতাঝরা হেমন্তে আসে লক্ষ মানুষ। বাহারি রঙের প্রকৃতি মন্ট-ট্রেম্বল্যান্ট এসে বিয়ের কনে সেজে বসে থাকে। এমনিতেই সুন্দরী, তার উপর বিয়ের সাজ! কতোটা ভয়ংকর রূপসী হতে পারে তা কল্পনা করাও কঠিন!

মন্ট্রিয়ল থাকতে সকল থ্যাংকসগিভিং ডে’তে ছুটে গেছি মন্ট-ট্রেম্বল্যান্ট। টরন্টো আসার পরেও থ্যাংকসগিভিং ডে কাটিয়েছি ওখানে। সর্বশেষ গিয়েছি অক্টোবর ২০১৬। এরপর আর যাওয়া হয়নি ।
এখন অন্টারিওর উত্তরাঞ্চলে হেমন্তের রঙিন দিন খুঁজি। কখনো জর্জিয়ান বে, কখনো গ্রাভেনহার্স্ট বা মুসকোকা লেক, কখনোবা হান্টসভিলে। এবার সেটাও সীমিত করে দিয়েছে করোনা। ঘুরেফিরে কেবল বাড়ির ধারে টরন্টোর অদূরে। বারকয়েক কলিংউড, ইলোরা আর ফার্গুস বেড়ানো। এই ইলোরা আবার মহারাস্ট্রের অজন্তা-ইলোরা নয়। সপ্তদশ শতকে প্রতিষ্ঠিত কানাডার একটি গ্রাম। এর পাশের গ্রাম ছিলো পিয়ারপয়েন্ট। আফ্রিকান দাসদের বসতি। বিশেষ করে সেনেগাল থেকে নিয়ে আসা দাস। ১৮৩৩ সালে স্কটিশরা বসতি গড়ে এখানে। এ্যাডাম ফার্গুসন নামের এক ভদ্রলোক সাত হাজার একর জমি কিনে শহর গড়ে তোলে। পিয়ারপয়েন্ট গ্রাম হয়ে যায় ফার্গুস টাউনশিপ।
গ্রান্ড নদীর (Grand River) পাড়ে অদ্ভূত সুন্দর ছোট্ট শহর! হেমন্তে ফার্গুসের বর্ণিল প্রকৃতি বারবার কাছে টানে আমাকে। গেলো আট দিনে তিনবার গেলাম বউসহ। কাছেই হাঁটার দূরত্ত্বে ছিমছাম টিম হর্টনস। একটা ব্ল্যাক আরেকটা রেগুলার মিডিয়াম কফি কিনি। পেডেস্ট্রিয়ান ব্রীজটায় দাঁড়িয়ে চুমুক দেই। লিড খুললেই ধোঁয়া ওঠে। ধোঁয়া ধোঁয়া স্বপ্ন জাগে। মনেহয়… এ্যাডাম ফার্গুসনের মতো কিছু জমি কিনে থেকে যাইনা কেনো??
