
কানাডার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন লিবারেল সরকার ও বিরোধী কনজার্ভেটিভদের মধ্যে নীতি-সংঘাত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এপ্রিলের নির্বাচনের সময় থেকেই কর হ্রাস থেকে শুরু করে জামিন সংস্কার বিভিন্ন নীতিগত ধারণা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে উৎসাহ দিয়ে আসছেন কনজার্ভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর। তবে পয়লিয়েভরের দাবি, কার্নি এসব ধারণা গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নে প্রকৃত সংরক্ষণবাদী অবস্থান নিচ্ছেন না; বরং তিনি করছেন “নকল সংরক্ষণবাদ”।
পয়লিয়েভর বলেন, কার্নি নিজেই স্বীকার করবেন যে তিনি কনজার্ভেটিভদের ধারণা গ্রহণ করেছেন। কার্বন করের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, কার্নি এর সবচেয়ে দৃশ্যমাণ অংশ ভোক্তা কার্বন প্রাইস বাতিল করলেও বাস্তবে অন্যান্য জ্বালানির ওপর কর বাড়াচ্ছেন। পয়লিয়েভরের মতে, এতে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমার বদলে অন্য পথে তা আরও বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর দীর্ঘ শাসনামলে লিবারেল দলকে সেন্টার-লেফট অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সেন্টারের দিকে নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা গেলেও, মার্ক কার্নির নেতৃত্বে সেই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পরিবেশমন্ত্রী স্টিভেন গাইলবোল্টের পদত্যাগকে। ট্রুডোর সময় যিনি পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, সেই গাইলবোল্ট সম্প্রতি কার্নির মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তার অভিযোগ, সরকারের নতুন জলবায়ু নীতিগুলো তার নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ করে পশ্চিম উপকূলে তেল পাইপলাইন অনুমোদনের পথ সুগম করতে আলবার্টা সরকারের সঙ্গে লিবারেলদের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার পরই গাইলবোল্ট এই সিদ্ধান্ত নেন। এই ঘটনাকে অনেকেই লিবারেল সরকারের পরিবেশনীতি থেকে সরে আসার একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, কনজার্ভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর অজনপ্রিয় লিবারেল নীতিগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করেছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালে তিনি “এক্স দ্য ট্যাক্স” কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী সফরে কয়েক মাস সময় ব্যয় করেন, যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা।
গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্ক কার্নির প্রথম বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ভোক্তা পর্যায়ের কার্বন প্রাইস বাতিল করা। তবে এর পরই পয়লিয়েভর ঘোষণা দেন, আগস্ট থেকে তিনি দেশজুড়ে “কার-নে ট্যাক্স” বিরোধী প্রচারণা চালাবেন। এই প্রচারণা মূলত ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বিক্রির জন্য সরকারের নির্ধারিত জনাদেশ বা ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে।
গ্রামীণ সংসদীয় এলাকা এবং গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইভি ম্যান্ডেট নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তাদের যুক্তি ছিল, অবকাঠামো ও বাজার প্রস্তুত না থাকায় এই বাধ্যবাধকতা বাস্তবসম্মত নয়। এরই প্রেক্ষাপটে গত সেপ্টেম্বরে লিবারেল সরকার ইভি ম্যান্ডেট স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। বর্তমানে এই কর্মসূচি পুনরায় পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।
করনীতি, পরিবেশনীতি ও শিল্পনীতি এই তিনটি ক্ষেত্রেই কার্নি সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী কনজার্ভেটিভরা। সামনে আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ে এই নীতিগত দ্বন্দ্বই কানাডার রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
