
কানাডাজুড়ে এখন একটি নতুন ট্রেন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার। জ্বালানী সাশ্রয়ী, চমৎকার মডেল এবং নানা কারণে ইভি এখন চনপ্রিয়। খ্যাতিমান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও সাশ্রয়ী দামে ক্রেতাদের ইভি সরবরাহ করছে। নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা ঝঁকছেন ইভির দিকেই। কিন্তু দীর্ঘযাত্রায় ইভির চার্জিং নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে এমন অভিযোগ অনেকের। টেসলা ওয়াই মডেল ব্যবহারকারি নিতা দেবনাথ বললেন, ইভি যেহেতু পরিবেশবন্ধব সেহেতু আমি খুবই পছন্দ করি। অনেক ফিচার রয়েছে যেটা রেগুলার গাড়িতে থাকে না। তবে অনেক সময় দীর্ঘযাত্রা পথে চার্জিং স্টেশন থাকে না।
কানাডার দূর প্রান্তের বিভিন্ন ইভি চালকরা এরকমই অভিযোগ করেন সবসময়। অবশ্য বাড়াতে চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণের নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ফেডারেল সরকার। তবে ঘোষণার ভাষা যতটা উচ্চাভিলাষী, বাস্তবায়ন কাঠামো ততটা স্পষ্ট নয় এমনই ইঙ্গিত মিলেছে।
গত সপ্তাহের মঙ্গলবার পার্লামেন্ট হিলে বিদ্যুৎমন্ত্রী টিম হজসন একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে অবশ্য তিনি ৮ হাজার ইলেক্ট্রিক ভেহিকল (ইভি) চার্জিং পোর্ট যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান।
টরন্টো বাংলাটাউনের এই প্রতিবেদককে পিকারিং হোন্ডার সিনিয়র ম্যানেজার আলী তালুকদার বলেন, দেশে বর্তমানে থাকা প্রায় ৩০ হাজার চার্জিং স্টেশনের সঙ্গে অতিরিক্ত ৮ হাজার ইলেক্ট্রিক ভেহিকল (ইভি) চার্জিং পোর্ট যুক্ত করতে ৮ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে কবে নাগাদ এই নতুন চার্জিং পোর্টগুলো স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। রাতারাতি কিংবা দ্রত এটা ঘটার সম্ভাবনা নেই। চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণে ১২২টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের পূর্ণ ব্যয় ফেডারেল সরকার এককভাবে বহন করবে, নাকি প্রাদেশিক সরকার বা বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থায়ন করা হবে সে প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে আর্থিক কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
কানাডা দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে ব্যাটারিচালিত গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে আসছে। সরকার আগেই জানিয়েছিল, নির্ধারিত জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে দেশে ব্যাপক সংখ্যক চার্জিং স্টেশনের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো সেই লক্ষ্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছে। অনেক কানাডিয়ান পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বেছে নিতে চান। কিন্তু ইভি এখনও তাদের কাছে তুলনামূলক ব্যয়বহুল। আবার পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন না থাকাও একটি বড় বাধা।ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে মূল্য ও অবকাঠামো দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চার্জিং স্টেশন সংখ্যা বাড়ানো শুধু শহরকেন্দ্রিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং মহাসড়ক, গ্রামীণ অঞ্চল এবং বাণিজ্যিক পরিবহন রুটেও দ্রুত চার্জিং সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ইভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘রেঞ্জ অ্যানজাইটি’ বা দূরপাল্লার ভ্রমণে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কাটানো কঠিন হবে।
কেবল অবকাঠামো নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইভি ব্যবহারের সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি খরচ সাশ্রয় এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করার ওপরও জোর দিয়েছেন কেউ কেউ।
এছাড়া ৫৭ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে কানাডিয়ান ফ্রেইট বা পণ্য পরিবহন কোম্পানিগুলোর জন্য। কম কার্বন নিঃসরণকারী যানবাহন কেনায় সহায়তা সংক্রান্ত তিনটি প্রকল্পে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। ভারী পরিবহন খাতকে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হলে জাতীয় পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টরন্টো ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির শিক্ষার্থী সামিয়া হোসেন তারফদার একজন ইভি লাভার। তিনি বলেন, যদিও নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা সরকারের জলবায়ু অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অনির্দিষ্ট রয়ে গেছে। যেমন – ৮ হাজার নতুন চার্জিং পোর্ট কবে নাগাদ স্থাপন সম্পন্ন হবে? প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে প্রাদেশিক সরকার ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা কী হবে? গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে কি না? এবং চার্জিং স্টেশনের ধরন কেমন হবে? অনেকেই ফাস্ট চার্জারের পক্ষে এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আবার লেভেল-টু চার্জার যদি বসানো হয় সেটা কোন অনুপাতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর না থাকায় বিরোধী দল ও নীতিনির্ধারক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নির্দিষ্ট সময়রেখা ও জবাবদিহি কাঠামো ছাড়া বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘোষণার বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন কঠিন হবে।
বাংলাদেশি কানাডিয়ান সিনিয়র সিটিজেন মজিবর মঞ্জু বলেন, কানাডার পরিবহন খাত বর্তমানে এক রূপান্তরমুখী পর্যায়ে রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হলেও মূল্য, অবকাঠামো এবং জনমানস এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নতুন ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতা নির্ধারণ করবে, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে দেশের জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারে।
নাগরিকরা পরিবেশবন্ধব ইভি কারের পক্ষে। কিন্তু সাশ্রয়ী মূল্য যেম জরুরী তেমনি জরুরী সহজলভ্য চার্জিং স্টেশনও। দূর যাত্রায় মানুষ প্রশান্তি পেতে চায়, বিড়ম্বনা নয়।
