
কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টোতে ওপিয়ড–সংক্রান্ত ওভারডোজের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে শহরের অন্যতম বড় চিকিৎসাকেন্দ্র সেন্ট মাইকেল’স হসপিটাল–এর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিষাক্ত স্ট্রিট ড্রাগের বিস্তার এবং নতুন ধরনের রাসায়নিক উপাদান মিশে যাওয়ার কারণেই পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে।
ফেব্রুয়ারি মাসেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ৫০ জন ওভারডোজ রোগীর চিকিৎসা দিতে হয়েছে জরুরি বিভাগে। অথচ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একই সময়ে এই সংখ্যা সাধারণত ২০ জনের কাছাকাছি থাকে। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসছেন।
হাসপাতালের এক কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাদকদ্রব্যে নতুন ধরনের দূষণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক স্ট্রিট ড্রাগে মেডেটোমিডিন নামের একটি শক্তিশালী উপাদান মেশানো হচ্ছে। এটি মূলত পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি সেডেটিভ বা অবসাদক, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিকিৎসকের ভাষায়, “যখন আমরা সন্দেহ করি যে মাদকদ্রব্য মেডেটোমিডিন দ্বারা দূষিত, তখন রোগীকে প্রথমেই নালোক্সোন দেওয়া হয়, যা ওপিয়ড ওভারডোজের ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এর পরেও রোগীদের দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়, কারণ তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।” অর্থাৎ শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না; রোগীদের দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় চিকিৎসা প্রয়োজন হচ্ছে।
শুধু হাসপাতাল নয়, টরন্টো শহরজুড়েই ওপিয়ড ওভারডোজের ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছে টরন্টো ওভারডোজ ইনফরমেশন সিস্টেম। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্যারামেডিকরা ৩৫০টি প্রাণহানীকর নয় এমন ওপিয়ড ওভারডোজ সংক্রান্ত কলের সাড়া দিয়েছেন। এর সঙ্গে যদি আগের বছরের তথ্য তুলনা করা হয়, তবে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ২২৯টি, যা এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এই বৃদ্ধি কেবল সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং জটিলতার দিক থেকেও উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের অবস্থা এতটাই গুরুতর হয়ে উঠছে যে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা জানিয়েছেন, জরুরি বিভাগে ওভারডোজ রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। এক চিকিৎসক স্বীকার করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে গেলে, আমি বলব না যে আমরা পুরোপুরি পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।”
ওভারডোজ প্রতিরোধ ও সহায়তা দেওয়ার জন্য শহরে যে বিশেষ কেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেখানেও মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই কেন্দ্রগুলোতে ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি ভিজিটরের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সহায়তা চাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রবণতা টরন্টোর মাদকসংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। তারা বলছেন, স্ট্রিট ড্রাগে বিপজ্জনক রাসায়নিক উপাদান মেশানোর কারণে ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ গ্রহণ করছেন। এ কারণে জরুরি পরিষেবা, হাসপাতাল এবং ক্ষতি–নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মসূচিগুলোকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টরন্টোতে ওপিয়ড সংকট এখন জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক করছেন যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
Rezaul Haque : Local Journalism Initiative Reporter
