
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নির্মাণাধীন একটি আধুনিক ও প্রবেশযোগ্য (অ্যাক্সেসিবল) খেলার মাঠের কাজ হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন টরন্টোর একদল অভিভাবক। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, তহবিল সংগ্রহ এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের পরও প্রকল্পটি মাঝপথে থেমে যাওয়ায় তারা এর কারণ জানতে সরব হয়েছেন। নিজেদের দাবি জানাতে তারা সম্প্রতি স্পিকার্স কর্ণারে উপস্থিত হয়ে দ্রুত নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর আহ্বান জানান।
ঘটনাটি টরন্টোর সানি ভিউ জুনিয়র অ্যান্ড পাবলিক স্কুলকে ঘিরে। স্কুলটিতে পড়াশোনা করা অধিকাংশ শিশুই বিভিন্ন ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। তাদের জন্য খেলার মাঠ শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে নতুন খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগকে অভিভাবকরা শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প হিসেবে দেখছিলেন।
স্কুলটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক অনু সিং জানান, পুরোনো খেলার মাঠটি এতটাই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে যে সেটি শিশুদের ব্যবহারের জন্য আর নিরাপদ নয়। তার ভাষায়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য খেলার মাঠের গুরুত্ব সাধারণ খেলার জায়গার চেয়েও অনেক বেশি। এটি তাদের জন্য এক ধরনের থেরাপির মতো কাজ করে, যেখানে তারা শারীরিক অনুশীলনের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জন করে।
তিনি বলেন, অনেক শিশুরই অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা অন্যান্য জটিল বিশেষ চাহিদা রয়েছে। তাই এমন একটি খেলার মাঠের প্রয়োজন, যেখানে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীসহ সব ধরনের শিশু সমানভাবে খেলাধুলা করতে পারবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নতুন প্রকল্পের নকশা তৈরি করা হয়েছিল।
এই উদ্যোগের সূচনা হয় ২০২২ সালে এক মর্মান্তিক ঘটনার পর। ওই বছর স্কুলটির এক শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যুর পর তার স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে পরিবারের সদস্যরা একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, শিশুটির স্মরণে এমন একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে, যা ভবিষ্যতে শত শত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর উপকারে আসবে।
এরপর শুরু হয় তহবিল সংগ্রহ অভিযান। স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, বিভিন্ন সংগঠন এবং শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। অর্থ সংগ্রহের পর স্কুল কর্তৃপক্ষ খেলার মাঠ নির্মাণের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও নকশা সিটি প্রশাসনের কাছে জমা দেয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর প্রকল্পটির অনুমোদনও মেলে। অনু সিং বলেন, এতদিনের পরিশ্রম সফল হয়েছে ভেবে সবাই অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। অবশেষে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও আধুনিক খেলার মাঠ বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে এই আশা নিয়েই সবাই অপেক্ষা করছিলেন।
গত মে মাসে নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পুরোনো খেলার মাঠটি ঘিরে ফেলে এবং নির্মাণের প্রস্তুতি নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল, গ্রীষ্মকালীন ছুটির শেষে সেপ্টেম্বরে যখন শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরবে, তখন তারা নতুন খেলার মাঠে খেলতে পারবে।
কিন্তু সেই আশায় বড় ধাক্কা লাগে চলতি মাসের শুরুতেই। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই নির্মাণকাজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা। কেন কাজ থামিয়ে দেওয়া হলো, কবে আবার শুরু হবে কিংবা প্রকল্পটি আদৌ শেষ হবে কি না এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো তারা পাননি।
অনু সিংয়ের অভিযোগ, সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পের নকশা ও পরিকল্পনা দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। তারা সবকিছু পর্যালোচনা করে অনুমোদনও দিয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় পারমিটও ইস্যু করেছিল। সেই অবস্থায় নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর হঠাৎ সেটি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। তার ভাষায়, “যদি কোনো সমস্যা থেকেই থাকে, তাহলে নির্মাণ শুরুর আগেই সেটি জানানো উচিত ছিল। এখন কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের শিশুরা।” অভিভাবকদের দাবি, প্রকল্পটি আর বিলম্ব না করে দ্রুত পুনরায় চালু করতে হবে। কারণ প্রতিটি দিন বিলম্বের অর্থ হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের একটি নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় খেলার পরিবেশ থেকে আরও দীর্ঘ সময় বঞ্চিত থাকা।
এদিকে সিটি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। তাদের আশা, প্রশাসন দ্রুত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেবে এবং নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করে শিশুদের জন্য প্রতিশ্রুত খেলার মাঠটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করবে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
