গ্রোসারি স্কেল আপনার সঙ্গে মিথ্যাচার করছে

Frozen milkfish portions in clear plastic bags piled in a grocery cart.
কানাডিয়ান ভোক্তারা ইতোমধ্যেই রেকর্ড পর্যায়ের খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন

কানাডাজুড়ে গ্রোসারি দোকানগুলোর মিট কাউন্টারে ব্যবহৃত ওজন মাপার যন্ত্রে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক এক তদন্তে। এই অনিয়মের ফলে ক্রেতারা প্রকৃত মূল্যের তুলনায় বেশি অর্থ পরিশোধ করছেন কিছু ক্ষেত্রে যা প্রতি প্যাকেজে ১১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা এবং তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কানাডিয়ান ভোক্তারা ইতোমধ্যেই রেকর্ড পর্যায়ের খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় পরিবারের বাজেট সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই যদি মাংসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যে ওজন কম দেখিয়ে বেশি দাম নেওয়া হয়, তাহলে তা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে। তদন্তে উঠে এসেছে, অনেক গ্রোসারি দোকানের মিট কাউন্টারে ব্যবহৃত স্কেলগুলো সঠিকভাবে ক্যালিব্রেটেড নয়। ফলে ক্রেতারা যে পরিমাণ মাংস কিনছেন বলে মনে করছেন, বাস্তবে তার চেয়ে কম পাচ্ছেন। অর্থাৎ, তারা অজান্তেই অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করছেন।

- Advertisement -

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কানাডায় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার রয়েছে, যাদের প্রত্যেকে বছরে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার ডলার খাদ্য খাতে ব্যয় করে। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ খরচ হয় মাংস কেনায়। সেই হিসেবে দেশটির বার্ষিক মাংসের বাজারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার (৫ হাজার কোটি ডলার)। এখন যদি ধরা হয় যে মোট লেনদেনের মাত্র ১০ থেকে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হচ্ছে এবং প্রতি প্যাকেজে ৪ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তাহলে বছরে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২০০ মিলিয়ন থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এই অর্থ কোনো সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, ফলে নীতিনির্ধারণেও এর প্রভাব প্রতিফলিত হয় না। কিন্তু বাস্তবে এই অর্থ সরাসরি পরিবারগুলোর পকেট থেকে চলে যাচ্ছে।

কানাডায় বাণিজ্যিক পরিমাপ যন্ত্রের সঠিকতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছে ফেডারেল সংস্থা মেজারমেন্ট কানাডা। তাদের কাজ হলো ব্যবসায় ব্যবহৃত ওজন ও পরিমাপের যন্ত্রগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং সঠিকতা বজায় রাখা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, কানাডিয়ান ফুড ইন্সপেকশন এজেন্সি (সিএফআইএ) খাদ্য নিরাপত্তা ও লেবেলিং সংক্রান্ত নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই সংস্থাগুলোর নজরদারিতে ঘাটতি থাকতে পারে। প্রশ্ন উঠছে এই অনিয়মগুলো এতদিন কীভাবে নজর এড়িয়ে গেল? নিয়মিত পরিদর্শন কি যথেষ্ট হচ্ছে না, নাকি প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে?

কানাডার খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়মের ঘটনা নতুন নয়। ২০১১-১২ সালের “গ্রেট কানাডিয়ান ম্যাপল সিরাপ হেইস্ট”-এর ঘটনা এখনো মানুষের মনে রয়েছে, যেখানে কুইবেকের মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ সিরাপ চুরি হয়েছিল। সেই ঘটনায় অপরাধীরা ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে কোনো দৃশ্যমান চোর নেই বরং এটি একটি নীরব, কাঠামোগত সমস্যা, যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে এবং সহজে ধরা পড়ে না। ফলে এটি আরও উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। যেমন : নিয়মিত ও কঠোর পরিদর্শন বৃদ্ধি, স্কেল ক্যালিব্রেশন বাধ্যতামূলক করা এবং তার প্রমাণ প্রদর্শন, ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।

মিট কাউন্টারের এই ওজন জালিয়াতি শুধু একটি কারিগরি ত্রুটি নয় এটি ভোক্তা আস্থার ওপর আঘাত। এমন সময়ে যখন সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল, তখন এই ধরনের গোপন অতিরিক্ত খরচ তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে, নাকি এই ব্যবস্থায় আরও বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন?

রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ

- Advertisement -

Read More

Recent