
কানাডার লিবারেল সরকার আবারও দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। সরকারের যুক্তি এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, যা ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে বিশ্লেষক, ভ্রমণকারী এবং আঞ্চলিক কমিউনিটির প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দেশের বিমান পরিবহন খাতকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অটোয়ার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। লিবারেল সরকারের স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে যে, কানাডার বাজেট ঘাটতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। যদিও পূর্বাভাসের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে, তবুও সরকারের ঋণের চাপ এবং নতুন সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা অর্থের বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করছে নীতিনির্ধারকদের।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার বিমানবন্দর অবকাঠামোকে আবারও “সম্ভাব্য আর্থিক সম্পদ” হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ২১টি প্রধান বিমানবন্দর ফেডারেল সরকারের মালিকানাধীন। তবে এগুলো সরাসরি সরকার পরিচালনা করে না; বরং অলাভজনক স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এসব বিমানবন্দর থেকে সরকার বছরে প্রায় ৫১ কোটি ২০ লাখ ডলার ইজারা রাজস্ব পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বিমানবন্দরগুলো বেসরকারি খাতে বিক্রি করা হয়, তাহলে সরকার এককালীন বিশাল অঙ্কের অর্থ পাবে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই স্থায়ী রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, এটি অনেকটা “তাৎক্ষণিক নগদ প্রবাহের জন্য ভবিষ্যতের নির্ভরযোগ্য আয় উৎস বিক্রি করে দেওয়ার” মতো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারপক্ষের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বিমানবন্দরের আধুনিকায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে পারবে, যা যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে সহায়ক হবে। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কানাডার বিমান পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার কথাও বলা হচ্ছে।
তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন বেসরকারি মালিকানা কি সত্যিই যাত্রীদের জন্য ইতিবাচক হবে? কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে বিমানবন্দর বেসরকারিকরণের পর যাত্রী ফি, পার্কিং চার্জ এবং অন্যান্য পরিষেবা ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে শেষ পর্যন্ত বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হয় সাধারণ যাত্রীদেরই।
কোভিড-পরবর্তী সময় থেকে কানাডার বিমান পরিবহন খাত এমনিতেই নানা সংকটে রয়েছে। যাত্রী সংখ্যা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও সেবার মান নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। দেশের দুটি বড় এয়ারলাইন এয়ার কানাডা ও ওয়েস্টজেট সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনায় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দুই সংস্থার মাত্র ৭৩ শতাংশ ফ্লাইট সময়মতো পরিচালিত হয়েছে, যা উত্তর আমেরিকার প্রধান এয়ারলাইনগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন অবস্থান।
বিশেষ করে এয়ার কানাডার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। শুধু ২০২৪ সালেই সংস্থাটি ১০ হাজার ৮০০-র বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এর ফলে যাত্রী ভোগান্তি যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কানাডার বিমান পরিবহন ব্যবস্থার সুনামও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দর বিক্রি করে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এর ফলে লাভকেন্দ্রিক পরিচালনা ব্যবস্থা যাত্রীসেবা ও আঞ্চলিক সংযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে ছোট শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলো কম লাভজনক হওয়ায় ভবিষ্যতে সেবার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
করদাতাদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, বর্তমানে বিমানবন্দরগুলো সরকারি সম্পদ হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কিন্তু বেসরকারিকরণের পর বিদেশি বিনিয়োগকারী বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো চলে গেলে জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এই ইস্যু আগামী দিনে কানাডার রাজনীতিতে বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে। একদিকে সরকারের অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে জনস্বার্থ এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন লিবারেল সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
