
কানাডার রেস্তোরাঁ শিল্প নতুন করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম আর্থিক প্রান্তিকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটির খাদ্যসেবা খাত ক্রমবর্ধমান ব্যয়, দুর্বল ভোক্তা ব্যয়ক্ষমতা এবং কমে যাওয়া গ্রাহক উপস্থিতির কারণে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম কঠিন সময়।
শিল্পসংগঠন রেস্টুরেন্ট কানাডা তাদের সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বছরের শুরু থেকেই রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা বিক্রি কমে যাওয়া এবং মুনাফা সংকুচিত হওয়ার বাস্তবতা টের পাচ্ছেন। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে, আর তার সরাসরি আঘাত পড়ছে রেস্তোরাঁ শিল্পে।
রেস্টুরেন্ট কানাডার প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কেলি হিগিনসন বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখবার কানাডিয়ানরা রেস্তোরাঁয় যান এবং এই শিল্প এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। কিন্তু যখন মানুষের হাতে অতিরিক্ত ব্যয় করার মতো অর্থ কমে যায়, তখন প্রথম ধাক্কাগুলোর একটি এসে লাগে রেস্তোরাঁ শিল্পে। তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক সংকটের সময় মানুষ প্রথমে যেসব খরচ কমায়, তার মধ্যে বাইরে খাওয়া অন্যতম। ফলে রেস্তোরাঁ শিল্প খুব দ্রুত চাপ অনুভব করে। বর্তমানে সেই চাপ আরও বাড়ছে।”
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্রায় ৫০ শতাংশ রেস্তোরাঁ মালিক জানিয়েছেন যে তাদের বিক্রি আগের তুলনায় কমেছে। একইসঙ্গে অর্ধেকের বেশি পরিচালনাকারী বলেছেন, রেস্তোরাঁয় অতিথির সংখ্যা কমে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৭১ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মুনাফা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, খাদ্যপণ্যের দাম এখনও তুলনামূলক বেশি। দ্বিতীয়ত, শ্রমিক ব্যয় বাড়ছে। তৃতীয়ত, উচ্চ সুদের হার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের খরচের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পরিবারগুলো এখন প্রয়োজনীয় খরচকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং বাইরে খাওয়ার মতো খরচ কমিয়ে আনছে।
রেস্টুরেন্ট কানাডার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ফুডসার্ভিস খাতে ২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০২৬ সালে বাণিজ্যিক বিক্রি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ খাতটি প্রবৃদ্ধি থেকে ধীরে ধীরে সংকোচনের দিকে যাচ্ছে।
রেস্তোরাঁ মালিকদের বড় অংশ খাদ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং কমে যাওয়া গ্রাহক উপস্থিতিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৩৬ শতাংশ রেস্তোরাঁ হয় লোকসানে চলছে, নয়তো আয়-ব্যয়ের সমতায় টিকে আছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এই হার প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, যা শিল্পটির আর্থিক দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির পরবর্তী সময়ে রেস্তোরাঁ শিল্প কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখালেও এখন আবার নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে এসেছে। ভোক্তারা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানকে কর্মী ধরে রাখতেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে ছোট ও মাঝারি রেস্তোরাঁগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকার কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর থেকে সাময়িকভাবে গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (জিএসটি) প্রত্যাহার করেছিল। এর মধ্যে রেস্তোরাঁর খাবারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কর ছাড় কার্যকর ছিল। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের ব্যয় কিছুটা কমানো এবং একই সঙ্গে রেস্তোরাঁ শিল্পকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদি কর ছাড় দীর্ঘমেয়াদে খাতের সংকট সমাধান করতে পারেনি। তারা এখন আরও নীতিগত সহায়তা, কর কাঠামোয় স্থিতিশীলতা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক প্রণোদনার দাবি জানাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি কানাডায় ভোক্তা আস্থা ও ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত পুনরুদ্ধার না হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে আরও বেশি রেস্তোরাঁ আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে স্বাধীন ও পরিবারভিত্তিক ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
