
কানাডার ওয়াইন শিল্প বর্তমানে এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক বাধাগুলো দূর করা গেলে এই খাত শুধু আরও বড় হবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও কয়েক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত যোগ করতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওয়াইনের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে কানাডা নিজেদের ওয়াইন শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ওয়াইন গ্রোয়ার্স অব কানাডার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে যদি কানাডিয়ান ভোক্তারা মোট ওয়াইন ব্যবহারের অন্তত ৫১ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদিত ওয়াইন থেকে সংগ্রহ করেন, তাহলে দেশের ওয়াইন শিল্পের বাজারমূল্য বর্তমান এক হাজার ১০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার ৩৭০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়লে শিল্পটির সামগ্রিক আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হবে।
একাধিক সূত্র এই প্রতিবেদককে জানায়, প্রায় দুই দশক ধরে কানাডার ওয়াইন বাজারে স্থানীয় পণ্যের অংশীদারিত্ব ৪০ শতাংশের আশপাশে স্থির রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এখন সময় এসেছে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদকদের আরও বেশি সুযোগ করে দেওয়ার।
ওয়াইন গ্রোয়ার্স অব কানাডার একজন মুখপাত্র বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য শুধু কানাডাজুড়ে ওয়াইনের বিক্রি বাড়ানো নয়, বরং বিদেশি ওয়াইনের আমদানি কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদকদের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা। তাঁর ভাষায়, “আমরা শুধু ৫১ শতাংশ বিক্রির লক্ষ্য পূরণ করতে চাই না। আমরা এই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই আমদানিকৃত ওয়াইনের পরিমাণ কমিয়ে।”
বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্তে জানা যায়, যেসব দেশে স্থানীয় ওয়াইনের ব্যবহার বেশি, সেসব দেশের শিল্পও তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী ও টেকসই। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ভোক্তাদের ব্যবহৃত মোট ওয়াইনের ৮৩ শতাংশই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। ফলে দেশটির ওয়াইন শিল্প শুধু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়নি, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কানাডার ওয়াইন শিল্প বর্তমানে যে বড় পরিবর্তনটি চায়, তা হলো প্রদেশভিত্তিক বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা শিথিল করা। এখন অনেক ক্ষেত্রে এক প্রদেশের ভোক্তা অন্য প্রদেশের ওয়াইন সরাসরি কিনতে পারেন না বা নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হন। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সীমাবদ্ধতা স্থানীয় ছোট ও মাঝারি উৎপাদকদের ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বড় খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রগুলো সাধারণত বেশি বিক্রি হওয়া জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ওয়াইন মজুদ রাখতে আগ্রহী থাকে। ফলে ছোট ও মাঝারি উৎপাদকদের পণ্য অনেক সময় বাজারে জায়গা পায় না। কিন্তু যদি ভোক্তারা সরাসরি অন্য প্রদেশের উৎপাদকদের কাছ থেকে ওয়াইন কিনতে পারেন, তাহলে ছোট ব্যবসাগুলোও নতুন ক্রেতা পাবে এবং পুরো শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়বে।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ৫০টির মধ্যে ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে ভোক্তারা সরাসরি ওয়াইন কেনার সুযোগ পান। এই নীতির ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন শিল্প ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। ২০২৪ সালে শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন শিল্পের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আঞ্চলিক ওয়াইন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
কানাডাও যদি অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বাধা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য সহজ বাজার তৈরি করতে পারে, তাহলে দেশটির কৃষি, পর্যটন ও খাদ্যশিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সব মিলিয়ে, কানাডার ওয়াইন শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্থানীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্য সহজ করা গেলে আগামী এক দশকে এই শিল্প দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
